০৭ অক্টোবর ২০২৫
নেপালে সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর তীব্র গণবিক্ষোভ—যাকে অনেকে ‘জেন-জি আন্দোলন’ বলছেন—শুরুতেই যে প্রশ্ন উঠেছিল, ‘তাদের লেনিন কোথায়’—তা এই ঐতিহাসিক আন্দোলনকে বোঝার জন্য ভুল দিকনির্দেশক প্রমাণিত হয়েছে। গত চার দশক ধরে নেপালে আত্মপ্রকাশ করা চালচিত্রগুলো যে ব্যর্থতাগুলো দেখিয়েছে, সেগুলো প্রতিবারই নেতাদের কারণে; কিন্তু এবার বিপ্লবটাই নেতার অনুপস্থিতিকেই শক্তি হিসেবে রূপান্তরিত করেছে।
ছাত্র ও তরুণরা যখন প্রথম ধ্বনি তুলেছিল—শুরুতে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপট থেকেই—রাষ্ট্রযন্ত্রের সাড়া ছিল নির্মম। প্রথমদিনে নিহতের সংখ্যা এবং ব্যাপক ধরপাকড় বিক্ষুব্ধ করে তোলে পুরো জাতিকে; এরপরই স্বতঃস্ফূর্ত এবং বিকেন্দ্রীকৃত বিক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী ও প্রদেশ জুড়ে। এই উপত্যকায় কেন্দ্রীয় নেতা না থাকায় আন্দোলনটি কঠোরভাবে রৈখিক নয়; বরং এটি ছিল অনানুষ্ঠানিক, বহু কণ্ঠে গড়া প্রতিক্রিয়া—যা রাষ্ট্রের ওপর আস্থা ভেঙে দেয়ার মতো জোরালো আঘাত হানে।
সংগ্রামের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য ছিল কঠিন। সংঘর্ষে বহু প্রাণহানি ও আহতের পাশাপাশি জনসাধারণের প্রতি আস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়ে; প্রশাসনিক ভবন এবং মিডিয়া প্রতিষ্ঠানসহ বহু দফতরে ক্ষতি হয়েছে—এগুলো শুধু প্রাত্তন ব্যয় নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর একটা গভীর আঘাত। তবু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে যায়: এই অভিজ্ঞতার পর নেপাল আবার কি একই পুরনো নেতৃত্ববৃন্দকে ক্ষমতায় স্বাগত জানাবে, নাকি ক্ষমতার ধারণাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে দেবে?

বিপ্লব যখন সবচেয়ে অশান্তির শিখরে পৌঁছায়, তখন নেতৃত্বের সংসর্গে একটা অন্যরকম চিত্র দেখা যায় — ‘হামি নেপাল’ বা অনলাইনে গঠিত গ্রুপগুলোর মতো সংগঠন মাঠে না থেকে পরবর্তী সময় মুখপাত্র হিসেবে সামনে আসে। সংঘাত লাঘবে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তে এক অনন্য প্রক্রিয়া দেখা যায়: আন্দোলনের অংশীরা ডিসকর্ড প্ল্যাটফর্মে মিলে-মিশে আভাস দেন, বিতর্ক করেন এবং ভোট-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব নির্বাচন করেন—এই অনলাইন-উদ্ভূত পলিসি-নির্ধারণ পদ্ধতি, যেখানে হাজারো কণ্ঠ সরাসরি যুক্ত ছিল, নেপালের রাজনৈতিক চিত্রের জন্য নতুন এক দিক উন্মোচন করেছে।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা না দেখলে ২০২৫-এর এই সঙ্কটকে আমরা ভুল বোঝা শুরু করব। ১৯৫০-এর প্রথম আন্দোলন, ১৯৯০-এর পুনরায় উত্থান এবং পরবর্তী মাওবাদী অধ্যায় প্রতিটি অভ্যুত্থানের পরে ‘সুপারস্ট্রাকচার’ কিভাবে বেইজে পরিণত হয়েছে, সেটাই হওয়া লক্ষণ যেন আজও রয়ে গেছে। এবার জেন-জি আন্দোলনের সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারেনেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতার পুরনো চক্র ভাঙার প্রত্যয় এবং ক্ষমতার অর্থই যদি বদলে দেওয়া যায়।
সবশেষে, এই আন্দোলন শুধুমাত্র রাজনৈতিক অবকাঠামোর পুনর্গঠন নয়; এটি সামাজিক বিশ্বাসের একটি পরীক্ষা—জনগণ ভোট, আলোচনায় এবং অনলাইন-জাগরণে যে ক্ষমতা দেখিয়েছে, তা কিভাবে প্রতিষ্ঠানসমূহে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা এখন নেপালের ভবিষ্যতের ইতিহাস যদি ন্যায্যভাবে বিচার করে, তাহলে ২০২৫-এর এই যাত্রাকে দেখা উচিত একটি দীর্ঘ সময়ের তিক্ততার ফলাফল মাত্র নয়—বরং একটি পুনর্গঠনের সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে।















