০৭ অক্টোবর, ২০২৫
সেপ্টেম্বরে হার বেড়ে ৮.৩৬ শতাংশে, গ্রামীণ পরিবারে সবচেয়ে বেশি চাপ
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মূল্যস্ফীতিতে এখন শীর্ষে বাংলাদেশ। সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৩৬ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮.২৯ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। অর্থাৎ, গত বছর সেপ্টেম্বরে যে পণ্য ১০০ টাকায় কেনা যেত, এখন তার জন্য দিতে হচ্ছে ১০৮ টাকা ৩৬ পয়সা।
🔹 ক্রয়ক্ষমতা কমছে, বেড়েছে দৈনন্দিন ব্যয়
অর্থনীতিবিদদের মতে, পণ্যের দাম বাড়লেও আয় অপরিবর্তিত থাকায় জনগণের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে—যা এক ধরনের ‘অদৃশ্য কর’ হিসেবে কাজ করছে। এর প্রভাবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সংসার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। কেউ ঋণ নিচ্ছে, কেউবা খাবার, পোশাক ও চিকিৎসার খরচে কাটছাঁট করছে।
সরকার চলতি অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই লক্ষ্যে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করে—যেখানে ঋণ নিয়ন্ত্রণ, সুদহার বৃদ্ধি ও অর্থ সরবরাহ সীমিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো দৃশ্যমান প্রভাব বাজারে দেখা যায়নি।

🔹 গ্রামীণ ব্যয় শহরের চেয়ে বেশি
বিবিএসের তথ্যমতে, সেপ্টেম্বরে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৬৪ শতাংশে এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৮.৯৮ শতাংশে।
শহরে যেখানে গড় মূল্যস্ফীতি ৮.২৮ শতাংশ, গ্রামীণ এলাকায় তা ৮.৪৭ শতাংশ—অর্থাৎ গ্রামের মানুষের ব্যয় আরও দ্রুত বাড়ছে।
গ্রামাঞ্চলে পোশাক, পরিবহন ও জ্বালানির খরচ বাড়ায় পরিবারের বাজেট আরও সংকুচিত হচ্ছে।
🔹 দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ সবচেয়ে এগিয়ে
তুলনামূলকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মুদ্রাস্ফীতির হার এখন অনেক নিচে:
- ভারত: ২.৭%
- পাকিস্তান: ৫.৬%
- শ্রীলঙ্কা: ১.৫%
- নেপাল: ১.৬৮%
- মালদ্বীপ: ৪.৬%
অর্থাৎ, বাংলাদেশের হার এসব দেশের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ, যা ২০১৩ সালের পর সর্বোচ্চ। তারা পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও মুদ্রাস্ফীতি দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ থাকবে—যদিও তা কিছুটা কমে ৮ শতাংশে নামতে পারে।
🔹 বাজারে বাস্তব চিত্র ভিন্ন
সরকারি হিসাব সামান্য ইতিবাচক হলেও, ভোক্তার বাস্তব অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। চাল, ডাল, ডিম, মুরগি, পেঁয়াজ—দৈনন্দিন নিত্যপণ্যের দাম এখনও আগের তুলনায় অনেক বেশি। ক্রেতাদের অভিযোগ, “হিসাবের তুলনায় বাজারে টাকার দাম অনেক কমে গেছে।”
🔹 বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পেছনে চারটি বড় কারণ রয়েছে—
- জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য
- আমদানি নির্ভরতা ও টাকার অবমূল্যায়ন
- দুর্বল বাজার তদারকি
- সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন,
“খাদ্য খাতের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে মানুষের দুর্ভোগ কমবে না। পরিসংখ্যানে ইনফ্লেশন কমলেও বাস্তবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে।”
তিনি পরামর্শ দেন,
“বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে, পাইকারি মনোপলি ভাঙতে হবে, খাদ্য আমদানিতে শুল্ক কমাতে হবে এবং কৃষিপণ্যের সরাসরি বিপণন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।”
বাংলাদেশ সরকার মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিগত কড়াকড়ি জারি রাখলেও বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরছে না। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, কৃষি ও শিল্পে উৎপাদন খরচ না কমলে এবং জ্বালানি খাতে সংস্কার না আনলে ২০২৬ সালেও ভোক্তারা স্বস্তি পাবেন না।
















