দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হলেও রাজনৈতিক সহিংসতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আস্থার সংকট নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকার বিজয়নগর এলাকায় আলোচিত এক ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি। প্রকাশ্য দিবালোকে মোটরসাইকেল আরোহীদের হামলায় গুরুতর আহত হাদি এখনো আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন। এই ঘটনা নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি মো. আবু শাদিক (কায়েম) অভিযোগ করেন, ক্ষমতাচ্যুত সরকারের অনুসারীরা নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, নির্বাচনের বিরুদ্ধে হুমকি ও কর্মসূচি ঘোষণার পর একজন প্রার্থীর ওপর হামলা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রায় ৪০ মাস পর ঘোষিত এই তফসিল দেশ-বিদেশে ব্যাপক নজর কাড়ে। টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জানান, একই দিনে ‘জুলাই চার্টার’ বাস্তবায়ন নিয়ে জাতীয় গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম।
তবে ঘোষণার পরও নির্বাচন নির্ধারিত সময়েই হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় পুরোপুরি কাটেনি। অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস একাধিকবার ভোট আয়োজনের আশ্বাস দিলেও মাঠপর্যায়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তফসিলকে স্বাগত জানিয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এটিকে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিতের পথে আনন্দের দিন বলে উল্লেখ করেন। জামায়াতে ইসলামীর মহাসচিব মিয়া গোলাম পরওয়ারও তফসিলকে স্বাগত জানান। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রধান সমন্বয়কারী নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আমার বাংলাদেশ পার্টি নির্বাচনকে স্বাগত জানালেও সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বড় বাধা হিসেবে দেখছে।
এর বিপরীতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ তফসিল প্রত্যাখ্যান করে একে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে। দলটির দাবি, বর্তমান প্রশাসনের পক্ষে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
ইতিমধ্যে দলগুলো প্রার্থী ঘোষণায় ব্যস্ত। বিএনপি ২৭২টি আসনে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে। এনসিপি ১২৫ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে এবং দেড় হাজারের বেশি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে। জামায়াতেও প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হলেও সমঝোতার ভিত্তিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এসব প্রস্তুতির মাঝেও নির্বাচনী উত্তেজনা তুলনামূলক কম। ঢাকার এক বেসরকারি চাকরিজীবী বিজয় তালুকদার বলেন, প্রথমবার ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও দেশে এখনো সেই নির্বাচনী উন্মাদনা নেই। এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থী আহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, অনিশ্চয়তা থাকলেও নির্বাচন থামবে না বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থাও রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তিনি বর্তমানে ভেন্টিলেশনে রয়েছেন। এদিকে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
এবার নির্বাচন কমিশন তুলনামূলক দীর্ঘ সময়সূচি দিয়েছে। ভোটের দিন সংসদ নির্বাচনের ব্যালট সাদা কাগজে এবং গণভোটের ব্যালট গোলাপি কাগজে ছাপা হবে। একই দিনে দুই ধরনের ভোট হওয়ায় ভোটগ্রহণের সময়ও বাড়ানো হবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভোটারদের নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিরপেক্ষতা, নিরাপত্তা ও জনআস্থা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কমিশনের সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ দাবি করেছেন, কমিশন নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে পরিচালনায় পুরোপুরি প্রস্তুত।
তবে একযোগে দুই ধরনের ভোট পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে আসা হুমকি সামলানো কমিশনের সক্ষমতাকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ব্যবসায়ী মহল বলছে, তফসিল ঘোষণায় সাময়িক অনিশ্চয়তা কমলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা নির্ভর করবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে ব্যবসা পরিকল্পনা সহজ হবে।
মানবাধিকার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। মানবাধিকার সহায়তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১০৭ জন নিহত এবং গণপিটুনিতে প্রাণ গেছে আরও ১৩০ জনের।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, ভোটের দিন প্রায় ৯৪ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হবে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী দেশে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন।
















