পার্বত্য পর্যটন এলাকা সাজেকে উত্থাপিত পাঁচ দফা দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো তীব্র সড়ক অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। উদ্ভূত এই জটিল ও অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা সমাধানে স্থানীয় হেডম্যান ও কারবারীদের নিয়ে এক জরুরি পরামর্শ সভার আয়োজন করেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। আজ রবিবার (২৫ অক্টোবর) সকালের দিকে রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে গুরুত্বপূর্ণ এই বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠিত ওই সভায় সাজেকের আইনশৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি দ্রুত ফিরিয়ে আনতে হেডম্যানদের উপযুক্ত প্রতিনিধি যুক্ত করে তিন সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত ও সমাধান কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভুইয়া, রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিবসহ স্থানীয় হেডম্যান ও কারবারীরা সশরীরে উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সাজেকের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির কার্যকর সমাধান এবং দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে তোলার লক্ষ্যে উপস্থিত অভিজ্ঞ হেডম্যান ও কারবারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন বাস্তবমুখী পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা গ্রহণ করা হচ্ছে। একই সাথে পাহাড়ের দীর্ঘদিনের এই সংকট থেকে কীভাবে একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের পথ খুঁজে বের করা যায়, সে বিষয়েও প্রতিনিধিরা বিস্তারিত আলোচনা করছেন।
অন্যদিকে, ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’ এবং ‘সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন’-এর যৌথ আহ্বানে আজও সাজেক আঞ্চলিক সড়কের হাজাছড়া, ১০ নম্বর গঙ্গাবাজার এবং ১৪ কিলোমিটার এলাকা সহ বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে সড়কের ওপর টায়ার জ্বালিয়ে ও ব্যারিকেড দিয়ে চরম অবরোধ কর্মসূচি পালন করছেন আন্দোলনকারীরা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস-সন্তু লারমা গ্রুপ) সশস্ত্র ও সক্রিয় সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে চিরতরে সরিয়ে নেওয়াসহ মোট পাঁচ দফা সুনির্দিষ্ট দাবিতে আন্দোলনের এই কঠোর কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। টানা এই অবরোধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে আজ রবিবার সকাল থেকেই সাজেকগামী ও সাজেক ছাড়ার প্রধান সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল পুরোপুরি স্তব্ধ রয়েছে, যার ফলে পর্যটক ও সাধারণ মানুষ ভোগান্তির মুখে পড়েছেন।
সার্বিক সংকট প্রসঙ্গে রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান গণমাধ্যমকে বলেন, “যেকোনো জটিল সমস্যার সমাধান কিন্তু একমাত্র কার্যকর আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা আসলে কার সাথে আলোচনার টেবিলে বসব? আন্দোলনকারীরা তো সামনে দৃশ্যমান নয়। তবুও আমরা তাদের সাথে সরাসরি কথা বলতে আগ্রহী। বর্তমান সরকারও যেকোনো বিরোধের শান্তিপূর্ণ আলোচনায় বিশ্বাসী। আমরা আলোচনার মাধ্যমেই দ্রুত সমাধান টানতে চাই এবং দৃঢ়ভাবে আশা করি, খুব দ্রুতই এই সমস্যার একটি ইতিবাচক সুরাহা হবে।”
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভুইয়া মন্তব্য করে বলেন, “মূলত সাজেক ভূখণ্ডে একটি বিশেষ রাজনৈতিক সংগঠন নিজেদের একক আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই উত্তেজনার মূল কারণ হলো তাদের অভ্যন্তরীণ শক্তির লড়াই। কিন্তু ক্ষমতার লড়াই গোপন রেখে সামনে হেডম্যান, কারবারি এবং সাধারণ ছাত্র-জনতার ব্যানার ব্যবহার করা হচ্ছে—যা মূলত একটি ছদ্মবেশ বা ফেইক কভার।”
তিনি আরও জানান, “ইতোমধ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতি ও স্থানীয় অসন্তোষ নিরসনে তিনজন অভিজ্ঞ হেডম্যান ও কারবারিকে অন্তর্ভুক্ত করে শক্তিশালী একটি তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সদস্যরা সরাসরি প্রান্তিক পর্যায়ে যাবেন এবং নিজেদের ভুক্তভোগী ও অংশীদার দাবি করা স্থানীয় হেডম্যান-কারবারীদের সাথে বিস্তারিত কথা বলবেন। আর পুরো এই আলোচনা ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় থাকবেন বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)।”


























