বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণের ফলে শহরগুলোর ভূমিকা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজধানী ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল শহর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০১১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে নগর জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ, যার একটি বড় অংশ গ্রাম থেকে শহরমুখী মানুষের স্থানান্তরের ফল। বর্তমানে দেশের চারজন দরিদ্র মানুষের একজন শহরে বসবাস করেন। তবে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে শহরগুলো এখনো প্রত্যাশিতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি।
মাত্র তিন দশকে বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বৈশ্বিক উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর ঘটিয়েছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে। গত ২৫ বছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে, আর উৎপাদন খাতের অংশ বেড়ে হয়েছে ২২ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে ২০১৬ সালের পর নতুন কর্মসংস্থানের বড় অংশ তৈরি হয়েছে কৃষিতে, যেখানে মজুরি তুলনামূলক কম এবং অনানুষ্ঠানিক কাজের প্রবণতা বেশি, যা কর্মসংস্থানের মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতের ভালো ও টেকসই কর্মসংস্থান কোথা থেকে আসবে, সেটি নির্ভর করবে শহর ও প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা প্রস্তুত তার ওপর। কর্মসংস্থানের ভৌগোলিক বণ্টন বোঝা এবং শহরগুলোর পরিকল্পিত সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে সরকারি নীতি ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করে, বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লেও বড় ও উচ্চ উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরেই দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৫৬ শতাংশ কেন্দ্রীভূত, যেখানে উৎপাদন শিল্প, রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান ও মজুরিভিত্তিক চাকরির বড় অংশ রয়েছে। এই করিডরের ভেতরেও গাজীপুর, মাধবদী-নরসিংদী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নোয়াখালীর মতো এলাকাগুলোতে কর্মসংস্থানের ঘনত্ব বাড়ছে।
এই অবস্থান নির্বাচন পুরোপুরি পরিকল্পিত নয়, আবার কাকতালীয়ও নয়। বাজারের আকার, শ্রমবাজারে সহজ প্রবেশাধিকার এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, যেগুলো এই কর্মসংস্থান করিডরের সঙ্গে যুক্ত, সেগুলো তুলনামূলক বেশি সফল, আর দূরবর্তী এলাকাগুলো পিছিয়ে রয়েছে।
তবে সমস্যা হচ্ছে, সরকারি বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার বড় অংশ এখনো কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত এবং গ্রামীণ এলাকামুখী। ঢাকার আশপাশে জনসংখ্যা ও কর্মসংস্থান যেখানে উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাড়ছে, সেখানে সড়ক উন্নয়ন বেশি হচ্ছে পূর্বের নিম্নভূমি ও বন্যাপ্রবণ এলাকায়। এই অসমতা পরিবহন ব্যয় বাড়াচ্ছে, উৎপাদনশীলতা কমাচ্ছে এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ঢাকা এখনো দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি হলেও, অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ, যানজট, জমির সংকট ও ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান শহরের বাইরের এলাকায় সরে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় এবং আরও দূরে নরসিংদী ও আরাইহাজারের মতো অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়েছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও দ্বিতীয় সারির শহরগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, কেন্দ্রীয় বাজেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সরকারের সীমিত ক্ষমতা নগর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য নীতি, বিনিয়োগ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশের পরিবর্তিত অর্থনৈতিক ভূগোলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। এর জন্য চারটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রথমত, স্থানিক পরিকল্পনা ও সরকারি বিনিয়োগের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা, যাতে উদীয়মান প্রবৃদ্ধি করিডরগুলো জাতীয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকারকে আরও ক্ষমতায়ন করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রের কাছাকাছি সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রপ্তানি অঞ্চলগুলোকে বাজারের চাহিদা ও অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা। চতুর্থত, ঢাকা ও চট্টগ্রামকে পূর্ণাঙ্গ মহানগর অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলে সমন্বিত পরিকল্পনা ও সেবা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
বিশ্লেষকদের মতে, কর্মসংস্থানের ভৌগোলিক চিত্র বাংলাদেশকে নতুন ও ভালো মানের চাকরি সৃষ্টির পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।
















