ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর এক স্থানীয় নেতার একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর দলীয় ‘রুকন’ পদটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত জামায়াত নেতার দৃঢ় দাবি যে, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ওই আপত্তিকর ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আধুনিক এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ সাজানো বা তৈরি করা হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মো. শহীদুল্লাহ (৪৬) নামের ওই জামায়াত নেতা ময়মনসিংহের নগরীর নতুন বাজার থানা শাখার রুকন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি তিনি পেশাগতভাবে স্থানীয় নওমহল এলাকার আল আরাবিয়া দাখিল মাদ্রাসার একজন অফিস সহকারী।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত সোমবার (২ নভেম্বর) সন্ধ্যায়। ওই দিন সন্ধ্যায় এক জরুরি সভার আয়োজন করে ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতের মজলিসে শূরা ও কার্যকরী কমিটি, যেখানে অভিযুক্ত নেতার বিষয়ে এই কঠোর সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর আগে ‘জেন-জেড ময়মনসিংহ’ নামক একটি সক্রিয় ফেসবুক গ্রুপে কিছু আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ক্লিপ পোস্ট করে দাবি করা হয় যে, এক প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে ময়মনসিংহের নির্দিষ্ট এক ওয়ার্ড জামায়াত নেতার অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, ওই ফেসবুক পোস্টে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী শহিদুল্লাহ কায়সারের সঙ্গে অভিযুক্ত ওই নেতার বিভিন্ন ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি ও সম্পর্কের কথাও ফলাও করে প্রচার করা হয়।
সামাজিক মাধ্যমে নিজের মানহানির ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন মো. শহীদুল্লাহ। দায়েরকৃত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, কোনো এক অজ্ঞাতনামা অপরাধী ব্যক্তি বা চক্র তাঁর ও তাঁর পরিবারের সামাজিক সম্মান ও মানহানি করার হীন উদ্দেশ্যে তাঁর এবং তাঁর স্ত্রীর ব্যক্তিগত ছবি বিভিন্ন মাধ্যম থেকে সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে সেগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সাহায্যে ডিজিটালভাবে এডিটিং বা সম্পাদনা করে ওই কাল্পনিক ভিডিও ও ছবিগুলো তৈরি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে মো. শহীদুল্লাহ গণমাধ্যমকে জানান, মূল ভিডিওটি একান্তই তাঁর নিজ স্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় ধারণ করা হয়েছিল। ঠিক কোন উপায়ে বা কারা তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোন বা তথ্য হাতিয়ে নিয়ে এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে, সে বিষয়ে তাঁর নিজের কোনো ধারণাই নেই। তাঁর প্রবল সন্দেহ, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে অজ্ঞাত কোনো প্রতিপক্ষ তাঁর ফোন হ্যাক করে কিংবা অন্য কোনো অসৎ উপায়ে এই ভিডিওটি ফাঁদ হিসেবে ছড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে আসন্ন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ইতিমধ্যে ব্যাপক প্রচারণা ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি শহিদুল্লাহ কায়সার।
তাঁর সঙ্গে অভিযুক্ত নেতার নাম জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়ে শহিদুল্লাহ কায়সার স্পষ্ট করে বলেন, “সিটি নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে যখন আমি বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ চালাই, তখন স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় অনেক মানুষ ও সমর্থক আমার আশপাশে থাকেন। এমনকি অন্য দল বা সাধারণ পেশার লোকজনও মাঝেমধ্যে সেই প্রচারণায় অংশ নেন। মো. শহীদুল্লাহও হয়তো অতীতে কোনো একটি গণসংযোগে আমার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। ঠিক সেই সময়ের একটি পুরোনো ছবি বা ক্লিপ ব্যবহার করে রাজনৈতিক কোনো বিরোধী পক্ষ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাকে ও আমার দলীয় ভাবমূর্তিকে হেয় করার জন্য অপপ্রচার চালাচ্ছ।”
পুরো বিষয়টি নিয়ে ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতের আমির কামরুল আহসান গণমাধ্যমকে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি যে আপত্তিকর ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ওই নেতার ব্যক্তিগত জীবনের বিষয়। তবে অভিযুক্ত নেতার নিজের দাবি অনুযায়ী ভিডিওটি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গেই ধারণ করা হয়েছিল এবং তাঁর মুঠোফোন হ্যাক করে বা অন্য কোনো প্রযুক্তির মাধ্যমে কেউ তা ইচ্ছাকৃতভাবে পাবলিকলি ছড়িয়ে দিয়েছে। এই সাইবার অপরাধের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত নেতা ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট থানায় সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়েরের পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মহানগর আমির আরও যোগ করেন, “ভিডিওর সত্যতা বা হ্যাকিংয়ের বিষয় যাই হোক না কেন, এ ধরনের একটি ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি ও নৈতিকতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আমরা আপাতত মো. শহীদুল্লাহর দলীয় রুকন পদটি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সংগঠনের শৃঙ্খলা ও নৈতিক স্খলনের প্রশ্ন আসায় আমরা এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।”


























