সাহারার উত্তপ্ত বালুকাময় প্রান্তর, যেখানে বাতাসে ঢেউ তোলে মরুর তপ্ত নিঃশ্বাস—সেই নিঃশ্বাসের ভেতরেই আবার জেগে উঠছে এক হারিয়ে যাওয়া প্রাণ, এক বিলুপ্তির গহ্বর ছুঁয়ে ফেরা আশ্চর্য প্রত্যাবর্তন। স্কিমিটার-হর্নড অরক্স নামে এই অ্যান্টেলোপকে একসময় ভাবা হয়েছিল চিরতরে হারিয়ে গেছে। কিন্তু মানুষের ধৈর্য, বিজ্ঞান আর নিবিড় ভালোবাসা তাকে ফিরিয়ে আনল পৃথিবীর আলোয়।
২০১২ সালের বসন্তে, দু’জন বিজ্ঞানী—মারি পেত্রেত্তো ও জন নিউবি—নেমে পড়েছিলেন চাদের ওয়াদি রিমে-ওয়াদি আচিম সংরক্ষণ এলাকায়। প্রখর রোদে জ্বলে যাওয়া এই বিস্তীর্ণ ভূমিকে তারা দেখছিলেন অরক্সের চোখ দিয়ে—কোথায় জল, কোথায় ছায়া, কোথায় খাদ্যের সম্ভাবনা। প্রথম দেখায় যা মনে হয় কেবল নির্জন মরুভূমি, একটু গভীরে গেলেই মেলে সবুজের ক্ষীণ আভা, সায়েল অঞ্চলের ঘাসভূমি, আর গিরিখাতের লুকানো জীবন। এই স্থানই শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হয় বিলুপ্ত অরক্সকে পুনর্জন্ম দেওয়ার ঘর হিসেবে।
কখনও নীল নদ থেকে আটলান্টিক পর্যন্ত বিচরণ করত এই অদম্য প্রাণী। দীর্ঘ বাঁকানো শিং, সূর্যের তাপে টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা, আর মাসের পর মাস পানিহীন থাকার যোগ্যতা তাকে মরুর সন্তান করে তুলেছে। অথচ ১৯৮০-র দশকে মানুষ, গুলি আর মোটরগাড়ির দাপটে পৃথিবী থেকে মুছে যায় এই প্রাণী। বেঁচে থাকে শুধু চিড়িয়াখানা আর সংরক্ষণাগারের সীমাবদ্ধ জীবন।
ইংল্যান্ডের মারওয়েল বন্যপ্রাণী পার্কে বছরের পর বছর ধরে পালিত হয় অরক্সের বংশধর। সেখানে তত্ত্বাবধায়কেরা এমনভাবে প্রতিটি অরক্সের জন্ম, রক্তরেখা ও বংশ পরম্পরা লিপিবদ্ধ রেখেছেন যেন এটি এক বিশাল ‘ম্যাচমেকিং’ নথি—যেন বাঁচিয়ে রাখতে হবে প্রতিটি সুষ্ঠু রক্তধারা, প্রতিটি জীবনের শিকড়।
এই ধৈর্য আর সচেতনতা একদিন ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ ফল দিল। বিশাল একটি কার্গো বিমানে করে ২৫টি অরক্সকে নিয়ে আসা হলো চাদের মরুভূমিতে। অচেনা বনে উন্মুক্ত আকাশের নিচে নেমে তারা যেন আবার শিখতে লাগল পূর্বপুরুষদের পায়ে হেঁটে যাওয়া পথ—কোথায় খাদ্য, কোথায় ছায়া, কোথায় বৃষ্টির জল।
তারপর থেকে ধীরে ধীরে এই মরুপ্রান্তর আবার প্রাণ ফিরে পেল। এখন সেখানে রয়েছে প্রায় ৬০০ অরক্স—একসময়ের বিলুপ্ত প্রাণী আজ আবার বাতাসের সঙ্গে দৌড়ায়, শিং তুলে চ্যালেঞ্জ ছোড়ে, আর জন্ম দেয় নতুন জীবনের আশা। আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ সংস্থা ইতিমধ্যে তাদের অবস্থান বদলে দিয়েছে—‘বন্যে বিলুপ্ত’ থেকে ‘বিপন্ন’। এ এক অভূতপূর্ব মানবিক বিজয়।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। মরুর বিস্তার থামাতে, বালুর স্রোত রুখে দিতে, হারিয়ে যাওয়া ঘাসভূমি ফিরিয়ে আনতে অরক্স হতে পারে প্রকৃতির অদম্য যোদ্ধা। তারা বীজ ছড়ায়, গাছ জন্মায়, আর বনের প্রাণীরা ফিরে পায় তাদের খাদ্যশৃঙ্খলায় হারানো এক স্তম্ভ। কিন্তু সবই সম্ভব তখনই, যখন মানুষও শিখবে এই প্রাণের সঙ্গে সহাবস্থান করতে—যখন স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা অরক্সের অস্তিত্বের সঙ্গে মিলে যাবে।
জন নিউবির ভাষায়—এ তো মাত্র শুরু। সামনে যত পথ, ততটাই কঠিন। প্রাণীরা নিজেদের প্রমাণ করেছে, এখন মানুষের পালা। বেঁচে থাকার ইচ্ছা যদি থাকে, তবে মরুপ্রান্তরেও আবার জন্ম নিতে পারে সবুজ, আর বিলুপ্তির অন্ধকার থেকেও ফিরে আসতে পারে নতুন সূর্যোদয়।
















