ভারতের ১.২ বিলিয়ন মোবাইল ব্যবহারকারীর দেশে নতুন স্মার্টফোনে সরকারি সাইবার নিরাপত্তা অ্যাপ প্রি-ইনস্টল বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত অবশেষে বাতিল করা হয়েছে। দিন কয়েক আগে জারি হওয়া এই নির্দেশ ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা, উদ্বেগ আর গোপন নজরদারির শঙ্কা ক্রমেই বাড়ছিল—শেষ পর্যন্ত সরকার চাপের মুখে পিছু হটল।
সরকার গত সপ্তাহে স্মার্টফোন নির্মাতাদের ৯০ দিনের মধ্যে সনচার সাথী নামে নতুন অ্যাপটি সব নতুন ফোনে আগাম ইনস্টল করার আদেশ দেয়। এমনকি অ্যাপটি যেন কেউ বন্ধ বা মুছতে না পারে, তাও স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল। এই শর্তই দেশজুড়ে দুশ্চিন্তার ঢেউ তোলে। বিশেষজ্ঞরা বলছিলেন—এটি নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় আঘাত, যেন নীরবে নজরদারির এক নতুন দরজা খুলে দেওয়া।
সরকার দাবি করেছিল—নকল বা প্রতারণামূলক হ্যান্ডসেট শনাক্ত করতেই এই উদ্যোগ। তবে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্দেশ্য যতই ভালো হোক, নাগরিকের স্বাধীনতা ও গোপনতা এর কাছে বড় প্রশ্নবিদ্ধ।
বুধবার হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়—অ্যাপটির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে, তাই আর বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু পেছনে ছিল আরও বড় চাপ—অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টরা নাকি এই নির্দেশ মানতে দ্বিধা জানিয়েছিল। কারণ, তাদের মতে—সরকার কোনো আগাম আলোচনা ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছে, যা ব্যবহারকারীর গোপনতার নিয়মের সঙ্গে অসংগত।
টেলিকম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অ্যাপটি ডাউনলোড করেছেন ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার প্রতারণার অভিযোগ আসে অ্যাপে, আর শুধু মঙ্গলবারই নতুন ৬ লাখ ব্যবহারকারী নিবন্ধন করেছেন—যা এক ধরনের বিস্ময়কর উল্লম্ফন।
তারপরও বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশনের নির্দেশ প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন—এটি নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করবে, এমনকি হয়তো নতুন নজরদারি ব্যবস্থার পথ খুলে দেবে।
যোগাযোগমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া অবশ্য অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন—সনচার সাথী অ্যাপ দিয়ে কোনো ধরনের গুপ্তচরবৃত্তি সম্ভব নয়, আর এমন কিছু কখনও ঘটবেও না।
তবুও ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো সরকারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারকে স্বাগত জানিয়েছে। ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন বলেছে—এটি অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে এখনো তারা সরকারি নির্দেশনার সম্পূর্ণ আইনি নথি দেখতে চায়। তাদের ভাষায়—এ মুহূর্তে স্বস্তি মিললেও এখনও নিশ্চিত সমাপ্তি নয়, বরং সতর্ক আশাবাদের সময়।
ভারতের ডিজিটাল প্রান্তরে তাই এখন এক ধরনের নীরব উত্তেজনা—নিয়ন্ত্রণ আর স্বাধীনতার মাঝখানে দোল খাওয়া এক দীর্ঘ শ্বাস, যা হয়তো আরও অনেক প্রশ্ন রেখে গেল নাগরিকদের মনে।
















