বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত চিত্রকর্মগুলোর একটি “হুইসলারের মাদার”। অসংখ্য কার্টুন, চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এটি এতবার ব্যবহার হয়েছে যে অনেকের কাছে এটি প্রায় এক ধরনের বৈশ্বিক প্রতীক হয়ে উঠেছে।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, এই চিত্রকর্মের শিল্পী জেমস অ্যাবট ম্যাকনিল হুইসলার সম্ভবত এর এমন জনপ্রিয়তাকে মোটেও পছন্দ করতেন না।
১৮৭১ সালে আঁকা এই চিত্রকর্মের আসল নাম ছিল “অ্যারেঞ্জমেন্ট ইন গ্রে অ্যান্ড ব্ল্যাক: পোর্ট্রেট অব দ্য পেইন্টার’স মাদার”। ছবিতে দেখা যায় শিল্পীর মা আনা ম্যাকনিল হুইসলারকে—একটি চেয়ারে বসা, শান্ত ও সংযত ভঙ্গিতে।
এই চিত্রকর্ম তৈরির ঘটনাটিও ছিল আকস্মিক। নির্ধারিত মডেল অসুস্থ হয়ে পড়ায় হুইসলারের মা নিজেই বসেছিলেন ছবির জন্য।
শুরুর দিকে ছবিটি খুব বেশি প্রশংসা পায়নি। সমালোচকরা বলেছিলেন, এটি আবেগহীন এবং অতিরিক্ত সরল। কারণ সে সময়ের দর্শকরা গল্পভিত্তিক ও নাটকীয় চিত্রকর্ম পছন্দ করতেন। কিন্তু হুইসলার বিশ্বাস করতেন “শিল্প শুধু শিল্পের জন্য”—অর্থাৎ চিত্রকর্মের মূল বিষয় হবে রং, গঠন ও নান্দনিকতা, কোনো গল্প নয়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছবিটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফ্রান্স সরকার এটি সংগ্রহে নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে ছবিটি নিয়ে আগ্রহ বাড়তে থাকে। পরে অর্থনৈতিক মন্দা ও যুদ্ধের সময়ে ছবিটি “মাতৃত্ব”, “সহনশীলতা” ও “পারিবারিক মূল্যবোধ”-এর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
১৯৩৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডাকটিকিটেও ছবিটির সংস্করণ প্রকাশ করা হয়, যেখানে লেখা ছিল—“আমেরিকার মায়েদের স্মরণে ও সম্মানে”।
এরপর থেকেই ছবিটি জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে। কার্টুন, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র এমনকি হাস্যরসাত্মক অনুকরণেও এটি ব্যবহার হতে থাকে। ডোনাল্ড ডাক থেকে শুরু করে নানা কাল্পনিক চরিত্র পর্যন্ত “হুইসলারের মাদার”-এর ভঙ্গিতে দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছবিটির জনপ্রিয়তার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ এর সরলতা। মাতৃত্ব একটি সার্বজনীন অনুভূতি, আর ছবিটির গঠন এত সহজ যে সহজেই অনুকরণ বা নতুনভাবে উপস্থাপন করা যায়।
তবে এই ব্যাপক জনপ্রিয়তা হুইসলারের নিজস্ব শিল্পদর্শনের বিপরীত ছিল। তিনি নিজেই একসময় লিখেছিলেন, শিল্পকে “ভালোবাসা, দেশপ্রেম বা আবেগের ফাঁদ” থেকে মুক্ত থাকতে হবে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার সেই সংযত, নীরব ও ধূসর চিত্রকর্মই হয়ে ওঠে আবেগ, মাতৃত্ব ও জাতীয় পরিচয়ের এক বিশ্বজনীন প্রতীক।
















