ইউরোপের দীর্ঘ যুদ্ধ-ছায়া আর নির্ভরতার শিকল কাটার পথে এগিয়ে এলো এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘোষণা করেছে—২০২৭ সালের নভেম্বরে শেষ হবে রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি। বহুদিনের বিতর্ক, দ্বিধা আর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর অবশেষে বুধবার ইউরোপীয় কাউন্সিল ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মধ্যে এই অস্থায়ী চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
যদিও নির্ধারিত সময়সীমা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ইচ্ছার তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে, তবুও এটি রাশিয়ার জ্বালানি নির্ভরতায় কাটছাঁট করে যুদ্ধের অর্থায়নে চাপ সৃষ্টির প্রবল প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রথম ধাপে ২০২৬ সালের শেষেই বন্ধ হবে রুশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) আমদানি। এরপর ২০২৭ সালের নভেম্বরে থেমে যাবে পাইপলাইনের গ্যাস প্রবাহও।
রাশিয়ার গ্যাসে নির্ভরতায় অর্ধেক ইউরোপ একসময় যেমন আবদ্ধ ছিল, যুদ্ধ শুরুর পর সেই শিকল ধীরে ধীরে আলগা হয়েছে। ২০২১ সালে যেখানে প্রায় ৪৫ শতাংশ গ্যাস আমদানি ছিল রাশিয়া থেকে, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ শতাংশে। তবুও LNG–এর ক্ষেত্রে রাশিয়া এখনো দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী।
ইউরোপীয় কমিশন এই সিদ্ধান্তকে এক নতুন সূর্যোদয়ের ইঙ্গিত বলে মনে করছে। কমিশন প্রেসিডেন্ট উরসোলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “ইউরোপ রাশিয়ান জ্বালানির কল বন্ধ করছে। এখান থেকেই শুরু হচ্ছে আমাদের জ্বালানি স্বাধীনতার যাত্রা।”
এনার্জি কমিশনার ড্যান জর্গেনসেন তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানান, ইউরোপ আর কোনোরকম চাপ, ব্ল্যাকমেইল বা বাজার-কারসাজির কাছে মাথানত করবে না। “আমরা পথ বেছে নিয়েছি নিরাপত্তার, স্বাধীনতার,” বলেছেন তিনি।
চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বরের পর কোনো দীর্ঘমেয়াদি পাইপলাইন গ্যাস চুক্তি নবায়ন করা যাবে না, আর ২০২৬ সালের জুনে নিষিদ্ধ হবে স্বল্পমেয়াদি চুক্তি। একইভাবে LNG–এর ক্ষেত্রেও ২০২৭ সালের শুরু থেকেই বন্ধ হবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পথ।
তবে এই সবকিছুর মাঝেও রাজনৈতিক ঝড় থামেনি। রাশিয়া-ঘনিষ্ঠ হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া বরাবরই রুশ জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরোধী। তাই চুক্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাঙ্গেরির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার সিজিয়ার্টো ঘোষণা করেন, বুদাপেস্ট এই সিদ্ধান্ত মানতে রাজি নয় এবং তারা ইউরোপীয় আদালতে চ্যালেঞ্জ জানাবে। স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকোও আইনি পদক্ষেপ বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ইউরোপ আজ জ্বালানি-নির্ভরতার দীর্ঘ অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে আলো খুঁজছে। এই আলো হয়তো একদিন রাশিয়ার যুদ্ধমেশিনকে দুর্বল করবে—আর ইউরোপের আকাশে ফিরবে শান্তির শ্বাস, স্বাধীনতার বাতাস।
















