মেদান, ইন্দোনেশিয়া – ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে নুরদিন ও তার স্ত্রীর ঘরে যখন হঠাৎ করেই বন্যার পানি ঢুকে পড়ে, তখন বৃদ্ধ দম্পতি বিছানার ওপরে উঠে আশ্রয় নেন। স্ট্রোকের পর থেকে চলাফেরায় অক্ষম নুরদিন তখন মৃত্যুকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “আমি ভেবেছিলাম এখানেই শেষ। বাড়ি ছেড়ে যেতে চাইনি। কিন্তু স্ত্রী জোর করায় শেষমেশ বের হতে রাজি হই।”
পানি দ্রুত বাড়তে থাকলে নুরদিনের ছোট ভাই প্রতিবেশীদের ডাকেন। ভোর চারটার দিকে প্রতিবেশীরা পৌঁছানোর সময় ঘরের ভেতর পানি ছিল বুকসমান। বের করে আনার সময় হঠাৎ জোরালো স্রোত প্রতিবেশীকে ফেলে দেয়, আর নুরদিনও পানিতে ডুবে যেতে থাকেন।
৭১ বছর বয়সী নুরদিন বলেন, “আমি ভাবছিলাম, এটাই আমার শেষ মুহূর্ত।” অবশেষে তারা প্রতিবেশীর বাড়িতে পৌঁছান, যদিও প্রবল বর্ষণে সেই বাড়িটিও নিরাপদ ছিল না। পরে সেনাবাহিনী এসে একটি টেবিলকে স্ট্রেচারের মতো ব্যবহার করে দম্পতিকে একটি মসজিদে নিয়ে যায়। সেখানে চার দিন কাটাতে হয়েছে তাকে, শরীরে ছিল শুধু একটি সারুং।
মসজিদে আশ্রয় নেওয়া আরেক ব্যক্তি নুরদিনকে জানান, তার বাড়ির পাশে কবরস্থান থেকে লাশ ভেসে উঠছিল বন্যার পানিতে। পানি নামার পর এখন পর্যন্ত নুরদিন নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেননি। ভাই গিয়ে দেখে এসেছেন—তার সম্পদের মাত্র এক শতাংশের মতো হয়তো বাঁচানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, “রেফ্রিজারেটর ভেঙে গেছে, রান্নাঘরের সব জিনিসপত্র নেই, কাপড়চোপড় সব কাদায় মাখা। বাড়ির সামনে আধা মিটার কাদা জমে আছে।”
ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় তীব্র বন্যা ও ভূমিধসে গত এক সপ্তাহে ১,১৪০ জনের বেশি মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ইন্দোনেশিয়াতেই নিহত হয়েছে অন্তত ৬৩১ জন। সুমাত্রার বহু এলাকা এখনো অগম্য থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
উত্তর আচেহর কুটা মাকমুর এলাকার ৭০ বছর বয়সী নুরকাস্যাহও সব হারানো মানুষের একজন। তিনি জানান, তার ওয়াশিং মেশিন, ফ্রিজ, রাইস কুকারসহ সব নষ্ট হয়ে গেছে। কিছুই ভেসে যায়নি, কিন্তু ঘরের ভেতর পানি ঢুকে সবকিছু অচল করে দিয়েছে।
তিনি পাঁচ দিন ধরে স্থানীয় একটি কমিউনিটি সেন্টারে আশ্রয় নিয়েছিলেন আরও ৩০০ মানুষের সঙ্গে। খাবারও ছিল অপ্রতুল—ভাত, ইনস্ট্যান্ট নুডলস আর কয়েকটি ডিমেই দিন কাটাতে হয়েছে তাদের।
এদিকে বন্যার দিনে নুরকাস্যাহর ছেলে নাসির আচেহ থেকে মেডান যাওয়ার পথে বাসেই আটকা পড়ে পাঁচ দিনের এক দুঃস্বপ্নের যাত্রা পার করেন। কুয়ালা সিম্পাং এলাকায় পৌঁছানোর পর ড্রাইভার জানান—সামনে যাওয়া বা ফিরে যাওয়া কোনোটাই সম্ভব নয়। পানি বাড়তে থাকায় যাত্রীরা সবাই বাসের ছাদে উঠে আশ্রয় নেন।
রবিবার সকালে নাসিরসহ কয়েকজন বিকল্প পথ খুঁজে বের করেন। এক জেলে তাদের নৌকায় করে কিছুটা পথ এগিয়ে দেন, তারপর একটি পিকআপ ভ্যানে মেডান পৌঁছান তারা। এখন তিনি আচেহে ফিরতে বিমানযোগে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, কারণ সড়কপথ এখনো বিপজ্জনক।
ইন্দোনেশিয়ার এই বন্যা শুধুই ঘরবাড়ি বা সামগ্রী নয়—মানুষের নিরাপত্তা, জীবিকা এবং বেঁচে থাকার আশাকেও ভেঙে দিয়েছে। বহু এলাকায় এখনো কাদা, ভাঙা রাস্তা ও গাছপালা অপসারণের চেষ্টা চলছে, আর জীবিতদের উদ্ধার কাজ চলছে ধীরগতিতে।
অসংখ্য মানুষ আজও জানে না—তাদের ঘর, তাদের স্মৃতি, তাদের জীবন—কতটা বাঁচানো যাবে, আর কতটা চিরতরে হারিয়ে গেছে এই বন্যার প্রবাহে।
















