বাংলাদেশে কন্যাশিশুদের সার্বিক সামাজিক অবস্থা নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন জাতীয় জরিপ ও মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যে এক গভীর ও জটিল চিত্র ফুটে উঠেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস)-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রতি দুজন তরুণীর মধ্যে প্রায় একজনের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বিশ থেকে চব্বিশ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশই শৈশবে বা অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ারও আগে এবং ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ ইতোমধ্যেই বিবাহিত জীবনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। ২০১৯ সালের ৫১ দশমিক ৪ শতাংশের তুলনায় এই হার কিছুটা হ্রাস পেলেও সামগ্রিক চিত্রটি এখনো অত্যন্ত উদ্বেগজনক রয়ে গেছে।
জাতীয় এই গড়ের আড়ালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও অর্থনৈতিক শ্রেণিতে ব্যাপক বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। এমআইসিএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি রাজশাহী বিভাগে (৬৭ শতাংশ), এরপর যথাক্রমে খুলনায় ৬৫ শতাংশ, রংপুরে ৬৩ শতাংশ এবং বরিশালে ৬১ শতাংশ। বিপরীতে সিলেটে এই হার সবচেয়ে কম (২৯ শতাংশ)। এছাড়া শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় বাল্যবিবাহের হার কিছুটা বেশি (৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বনাম ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ)। অর্থনৈতিক অবস্থার পার্থক্যের কারণে এই বৈষম্য আরও তীব্র রূপ নেয়; যেখানে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের মধ্যে ১৮ বছরের নিচে বিয়ের হার ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ, সেখানে ধনী পরিবারে তা ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ। যদিও সরকার অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে রোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ এবং চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ১০টি জেলার ১০২টি ইউনিয়নে জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে যুক্ত করে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন ডিজিটাল করার একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছে, তবুও বয়স গোপন করে বাল্যবিবাহ দেওয়ার প্রবণতা এখনো পুরোপুরি থামানো যায়নি।
কন্যাশিশুদের শিক্ষাগত অগ্রগতির চিত্রটি বেশ আশাব্যঞ্জক হলেও পরবর্তী ধাপগুলোতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে স্কুলে মেয়েদের উপস্থিতি এবং অংশগ্রহণ ছেলেদের তুলনায় বেশ ভালো। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলা হাসেও মেয়েরা স্পষ্ট এগিয়ে ছিল, যেখানে পাসের হার ছিল ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং মোট ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন ছাত্রী জিপিএ-৫ লাভ করেছে, যা ছেলেদের তুলনায় ১১ হাজার ১১৬ জন বেশি। তবে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার হার ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশ থাকলেও উচ্চ মাধ্যমিকে এসে তা মাত্র ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে যায়। অর্থাৎ মাধ্যমিকের পর মেয়েদের শিক্ষার পথ অনেকাংশেই সংকুচিত হয়ে পড়ে, যার পেছনে আর্থিক অসচ্ছলতা ও বাল্যবিয়ে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষার সমাপ্তি ও বাল্যবিয়ে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে কিশোরী মাতৃত্বের ঝুঁকি। সর্বশেষ এমআইসিএস অনুযায়ী, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি ১ হাজার কিশোরীর মধ্যে বছরে ৯২টি শিশুর জন্ম হচ্ছে, যা ২০১৯ সালের ৮৩ থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে রংপুর (১১১), খুলনা (১০৯) এবং রাজশাহীতে (১০৪) কিশোরী মাতৃত্বের হার অত্যন্ত বেশি। এর পাশাপাশি শিশুশ্রমের পরিসংখ্যানেও কন্যাশিশুরা গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত থাকলেও মেয়েদের শ্রমের একটি বিশাল অংশ পরিবারের অভ্যন্তরে রান্না, গৃহস্থালি ও ছোট ভাইবোনের দেখাশোনার মতো কাজে সীমাবদ্ধ থাকায় তা প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থেকে যায় এবং অদৃশ্য বৈষম্যের জন্ম দেয়।
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ ও উদ্বেগের চিত্রটি রয়েছে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা ও সহিংসতার ক্ষেত্রে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশব্যাপী ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪০৪টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে ২৩৮টিই শিশু ও কিশোরী এবং ৪৭৩টি যৌন হয়রানির ঘটনার মধ্যে ১৭৩টি শিশু শিকার হয়েছে। এছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন সহিংসতায় ১৯৫ শিশু নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ২১ শিশু ধর্ষণের পর খুন এবং ১৭ শিশু আত্মহত্যা করেছে। এছাড়া ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে শারীরিক বা মানসিক শাস্তির শিকার হয়, যার একটি বড় অংশ ঘটে খোদ পরিবারের ভেতরেই। অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত করতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভাগীয় পর্যায়ে ডিএনএ ল্যাবরেটরি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিলেও, কন্যাশিশুদের সামগ্রিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, সমঅধিকার এবং সুরক্ষার ক্ষেত্রে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আরও জোরালো ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।


























