ইসলামাবাদ থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন মূল্যায়নে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সঙ্কটের মূল কারণ হলো ব্যাপক দুর্নীতি ও ‘স্টেট ক্যাপচার’, যেখানে নীতিমালা ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক গোষ্ঠী নিজেদের লাভে ব্যবহার করে।
নভেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত ১৮৬ পৃষ্ঠার ‘গভর্নেন্স অ্যান্ড করাপশন ডায়গনস্টিক অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনটি পাকিস্তানের দুর্বল প্রতিষ্ঠান, অকার্যকর শাসনব্যবস্থা এবং জনসম্পদের অপচয়ের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও বিশেষাধিকারের সুরক্ষা না ভাঙলে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্থবিরতা আরও গভীর হবে।
আইএমএফের দাবি, দুর্নীতি পাকিস্তানে “স্থায়ী এবং ক্ষয়িষ্ণু প্রভাব ফেলছে” যা বাজারকে বিকৃত করছে, জনআস্থা নষ্ট করছে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে সুশাসন সংস্কার বাস্তবায়ন করলে পাকিস্তান ৫ থেকে ৬.৫ শতাংশ পর্যন্ত জিডিপি বাড়াতে পারে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক নীতি বিশেষজ্ঞ স্টেফান ডারকন আল জাজিরাকে বলেন, জবাবদিহির অভাবই দেশে দ্রুত অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাকিস্তান ১৯৫৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ২৫ বার আইএমএফের সহায়তা নিয়েছে। বর্তমান কর্মসূচি দেশটিকে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে ২০২৩ সালে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খাত—যেমন রিয়েল এস্টেট, জ্বালানি, উৎপাদন এবং সামরিক সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলো—এলিটদের প্রভাবের কল্যাণে অস্বাভাবিক সুবিধা পায়। করফাঁকি, ভর্তুকি ও বিশেষ ছাড়ের কারণে ২০২৩ অর্থবছরে একাই পাকিস্তানের জিডিপির ৪.৬১ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে।
বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে ২০২৩ সালে গঠিত স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কাউন্সিল (এসআইএফসি), যেখানে বেসামরিক-মিলিটারি নেতৃত্ব মিলিতভাবে বিনিয়োগ সহজ করার ক্ষমতা পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কাউন্সিলের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। তাদের দেওয়া আইনি ছাড় ও গোপন প্রক্রিয়া দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
আইএমএফ সুপারিশ করেছে, এসআইএফসিকে বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে, যেখানে সব বিনিয়োগ প্রকল্পের বিস্তারিত, দেওয়া ছাড় এবং যুক্তিগুলো উল্লেখ থাকবে।
এছাড়া বিচারব্যবস্থার ওপরও প্রতিবেদনে তীব্র সমালোচনা এসেছে। পাকিস্তানের আদালত ব্যবস্থায় দুই মিলিয়নের বেশি মামলা ঝুলে আছে। সাম্প্রতিক সাংবিধানিক সংশোধনগুলো সমালোচনার মুখে পড়েছে, কারণ তা সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা কমিয়ে সরকারের প্রভাব বাড়াতে পারে বলে আইনজীবীরা অভিযোগ করছেন।
ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরো (ন্যাব) ও ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (এফআইএ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার অভিযোগও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সুপারিশ নতুন নয়; বহু বছর ধরে একই পরামর্শ দেওয়া হলেও রাজনৈতিক অনীহার কারণে বাস্তবায়ন হয়নি।
লাহোরের অর্থনীতিবিদ আলি হাসানাইন বলেন, সমস্যার মূল রাজনৈতিক। রাজনৈতিক স্বার্থ বদলানো ছাড়া দুর্নীতি ও এলিট ক্যাপচার রোধ সম্ভব নয়।
অন্যদিকে পলিসি গবেষক সাজিদ আমিন জাভেদ বলেন, পাকিস্তানের বাজেট ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজন। সর্বনিম্ন দরদাতাকে চুক্তি দেওয়া হয়, কিন্তু এতে মানের নিশ্চয়তা থাকে না।
তিনি বলেন, “স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত অর্থনীতি চাইলে পুরো অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন ছাড়া বিকল্প নেই।”
















