যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তথাকথিত “কার্টেল দে লস সোলেস” নামের একটি গোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ওয়াশিংটন বলছে, এই সিদ্ধান্ত মাদক পাচার দমন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য জরুরি। তবে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরাতেই যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ।
নভেম্বর ১৬ তারিখে ঘোষণার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই কার্টেলটি মাদুরোর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় এবং এতে দেশটির সামরিক বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারাও জড়িত। তবে মাদুরো নিজে মাদক পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং কার্টেলের অস্তিত্বকেই ‘মিথ্যা বর্ণনা’ বলে দাবি করেছেন।
ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপকে “উদ্ভট মিথ্যা ও ভবিষ্যৎ সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত” বলে উল্লেখ করেছে।
কার্টেল দে লস সোলেস কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রচলিত অর্থে কোনো সংগঠিত আন্তর্জাতিক মাদক কার্টেল নয়। ইনসাইটক্রাইম গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, ১৯৯০-এর দশকে ভেনেজুয়েলার সেনা কর্মকর্তাদের ইউনিফর্মে থাকা ‘সূর্যের প্রতীক’ থেকেই এই নামের উদ্ভব।
গোষ্ঠীটি মূলত ভেনেজুয়েলার সামরিক কাঠামোর ভেতরে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ছোট ছোট নেটওয়ার্ক, যারা দুর্নীতি ও মাদক বাণিজ্যে জড়িত বলে অভিযোগ আছে।
তবে উল্লেখযোগ্য হলো—জাতিসংঘ বা যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) কখনো তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই গোষ্ঠীকে আলাদা একটি মাদক কার্টেল হিসেবে উল্লেখ করেনি।
‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা মানে কী?
সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করার পর এখন যুক্তরাষ্ট্রে কার্টেলটিকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। যুক্তরাষ্ট্রে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা যাবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সেখানে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যাবে।
এ ছাড়া বিদেশি কোম্পানিগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে, কারণ সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই তালিকাভুক্তির ফলে ভেনেজুয়েলায় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আরও শক্ত আইনি ও রাজনৈতিক ভিত্তি পাবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
কেন এই পদক্ষেপ নিল যুক্তরাষ্ট্র?
মাদুরোকে বেআইনি ক্ষমতাসীন বলে দাবি করছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে কথিত মাদকবাহী নৌকা লক্ষ্য করে একাধিক সামরিক হামলা চালিয়েছে, যেখানে অন্তত ৮৩ জন নিহত হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন বারবার বলছে, মাদুরোই কার্টেল দে লস সোলেসের প্রধান এবং তিনি ট্রেন দে আরাগুয়া নামের আরেক অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গেও যুক্ত।
গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর গ্রেফতারের তথ্যের বিনিময়ে পুরস্কার ২৫ মিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫০ মিলিয়ন ডলার করে।
মাদুরো পাল্টা অভিযোগ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র “একটি নতুন যুদ্ধের ভিত্তি তৈরি করছে” এবং সিআইএ ভেনেজুয়েলায় গোপন কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান
সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় অঞ্চলে বড় ধরনের নৌবহর মোতায়েন করেছে, যার মধ্যে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ ও আধুনিক বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড।
যদিও মার্কিন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই রণতরি মাদকবিরোধী অভিযানের জন্য নয়, বরং বৃহত্তর সামরিক শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে।
এরপর কী হতে পারে?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলায় কি পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা নিয়ে তিনি “আংশিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন”, তবে এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
মাদুরোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সুযোগ আছে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা জারির পর ছয়টি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন ভেনেজুয়েলায় ফ্লাইট স্থগিত করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
















