দখলকৃত পশ্চিম তীরের কুসরায় তিন ফিলিস্তিনি পরিবারকে নিজ নিজ বাড়িতে অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। এতে পরিবারগুলোর পানি, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জমি দখল করে তাদের উচ্ছেদ করতেই এই অবরোধ চালানো হচ্ছে।
নাবলুসের দক্ষিণে অবস্থিত কুসরা গ্রামের একটি বাড়ির চারপাশে বসতি স্থাপনকারীদের অবস্থানের দৃশ্য বুধবার নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধরা পড়ে। অবরুদ্ধ বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রোববার থেকে বাড়ির প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
অবরুদ্ধ পরিবারের সদস্য আয়েশা আবু রিদা বলেন, তারা বাড়ি ছেড়ে যাবেন না। পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও তারা নিজেদের বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। তাদের দাবি, বারবার হামলা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত লোয়াই রিদি জানান, তার ভাই ও ভাতিজাসহ পরিবারের সদস্যরা বাড়ির ভেতরে আটকা পড়েছেন। সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তারা সাময়িক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং শীতকালে সংরক্ষণ করা কূপের পানির ওপর নির্ভর করছেন।
রিদির ভাষ্য, বাড়িতে থাকা পরিবারের কাছে আর মাত্র কয়েক দিনের খাবার রয়েছে। তার আশঙ্কা, পরিবারের সদস্যরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে বসতি স্থাপনকারীরা সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটি দখল করে নিতে পারে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সহায়তার জন্য সেনাদের ডাকা হলেও তারা কার্যকরভাবে বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে দেয়নি। বুধবার ইসরায়েলি বাহিনীর আরও সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে বসতি স্থাপনকারীদের একটি তাঁবু সরিয়ে দেয় এবং কয়েকজনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। পরে তারা সেখান থেকে সরে যায়।
পরবর্তীতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ওই এলাকায় আরও একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন মোতায়েনের ঘোষণা দেয়। সামরিক নেতৃত্ব ঘটনাস্থলে শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে।
এর এক দিন আগে ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছিল, ওই এলাকায় বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ও জমিতে প্রবেশ করে সেগুলো দখলের চেষ্টা করেছে। বাহিনী এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে অবৈধ, নিন্দনীয় ও অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করে। ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়।
তবে অবরুদ্ধ পরিবারের স্বজনদের অভিযোগ, বাস্তবে বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাদের মতে, এতে পরিবারগুলোর নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে।
কুসরায় নতুন নয় ভূমি নিয়ে সংঘাত
দখলকৃত পশ্চিম তীরের কুসরা এমন একটি এলাকায় অবস্থিত, যেখানে ভূমি দখল ও বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা রয়েছে। গত মাসেও গ্রামে একটি নতুন নির্মিত মসজিদে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
পার্শ্ববর্তী জালুদ গ্রামেও জুলাই মাসে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে একই ধরনের অবরোধের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় দুটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে তাদের জমি থেকে সরে যেতে হয় এবং পরে বসতি স্থাপনকারীরা জায়গাটি দখল করে নেয়।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দখলকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও ভূমি দখলের ঘটনা বেড়েছে। ইসরায়েলের বর্তমান ডানপন্থী সরকারের সময়ে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণও দ্রুত হয়েছে।
পশ্চিম তীরে পাঁচ লাখের বেশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছেন। একই এলাকায় প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি রয়েছেন। ১৯৬৭ সাল থেকে অঞ্চলটি ইসরায়েলের দখলে রয়েছে।
জাতিসংঘের উদ্বেগ
জাতিসংঘ জানিয়েছে, দখলকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি এখন গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি বছরে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ৭৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৮ জন শিশু।
জাতিসংঘের হিসাবে, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া এবং উচ্ছেদের কারণে প্রায় তিন হাজার আটশ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাদের প্রায় অর্ধেকই শিশু।
জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার উপ-সমন্বয়ক রামিজ আলাকবারভ জানিয়েছেন, চলতি বছরে প্রায় ২৬০টি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের এক হাজার চারশর বেশি হামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব হামলায় হতাহত ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং অনেক ঘটনা ইসরায়েলি বাহিনীর উপস্থিতিতেই ঘটেছে।
তিনি আরও জানান, চলতি বছরে পশ্চিম তীরে প্রায় ১২ হাজার ৩৬০টি বসতি নির্মাণের আবাসন ইউনিট অনুমোদন বা এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পূর্ব জেরুজালেমে রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার ১৬০টি ইউনিট।
জাতিসংঘের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এর ফলে পশ্চিম তীরের বাস্তব পরিস্থিতি পরিবর্তিত হচ্ছে, ফিলিস্তিনি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হচ্ছে এবং অঞ্চলটিতে কার্যত সংযুক্তিকরণের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে।
















