কোটি মানুষের ঢাকা ছাড়ার পর দূষণমুক্ত বাতাস ও যানজটহীন রাজপথ; পরিকল্পিত নগরায়ণ ও আঞ্চলিক উন্নয়নই দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথ
পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে প্রতি বছর রাজধানী ঢাকা এক অনন্য রূপ ধারণ করে। প্রতিদিনের কানফাটা হর্ন, ডিজেলের কালো ধোঁয়া আর অন্তহীন যানজটের চেনা দৃশ্যপট কয়েক দিনের জন্য উধাও হয়ে যায়। উত্তরা থেকে ধানমণ্ডি যেতে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যেত, এখন তা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ৩০ মিনিটে। বনানী বা মহাখালীর ওভারপাসে দাঁড়ালে এখন গাড়ির শব্দের বদলে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যায়। ঢাকা ছাড়ছে প্রায় কোটিরও বেশি মানুষ।
কিন্তু এই স্বস্তির পেছনে লুকিয়ে আছে এক রূঢ় বাস্তবতা ঢাকা আজ কেবল একটি কর্মস্থলে পরিণত হয়েছে, একে ‘নিজেদের শহর’ বা ‘আসল বাড়ি’ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি অধিকাংশ মানুষ। রিকশাচালক থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ নির্বাহী, সবাই এই যান্ত্রিক নরক যন্ত্রণা সহ্য করেন কেবল সুযোগ-সুবিধার অতিমাত্রায় কেন্দ্রীকরণের কারণে। ঈদের এই ফাঁকা শহর আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, একটি বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলা শারীরিকভাবে সম্ভব, যদি আমরা সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করি।
বিশ্বের বড় বড় শহর যেমন মুম্বাই, লাগোস বা জাকার্তাও একই ধরনের উৎসবকালীন অভিবাসনের মুখোমুখি হয়। তবে তারা এই চাপ সামলাতে কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ নীতি গ্রহণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, মুম্বাইয়ের চাপ কমাতে নাভি মুম্বাইয়ের মতো স্যাটেলাইট টাউন বা উপশহর গড়ে তোলা হয়েছে। ঠিক একইভাবে ঢাকার ওপর চাপ কমাতে হলে সরকারি হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্পকারখানাগুলোকে ঢাকার বাইরে আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোতে সরিয়ে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
শুধুমাত্র অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং ঢাকার বাইরে ব্যবসা স্থানান্তরের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং দ্রুতগতির কমিউটার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমানের ‘ঈদের ঢাকা’ আমাদের যে নির্মল বাতাসের স্বাদ দিচ্ছে, তা ধরে রাখতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে পরিকল্পিত আঞ্চলিক উন্নয়নের বিকল্প নেই।
অবশ্যই এই রূপান্তর সহজ নয়; বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করতে সরকার, বেসরকারি বিনিয়োগকারী এবং স্থানীয় জনপদগুলোর মধ্যে নিবিড় সমন্বয় প্রয়োজন। স্বার্থান্বেষী মহলের বাধা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনবলের অভাবের মতো চ্যালেঞ্জ থাকলেও সুনির্দিষ্ট বাজেট এবং সময়সীমা নির্ধারণ করে এগোতে হবে। নীতিনির্ধারকদের উচিত এখনই পাবলিক কনসালটেশনের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক শহরগুলোকে চিহ্নিত করা এবং পাইলট প্রকল্প শুরু করা।
ঈদের ছুটি শেষ হতেই কমলাপুর স্টেশনে আবার ফিরতি মানুষের ঢল নামবে, যানজট আর কোলাহলে ঢাকা আবার আগের রূপে ফিরবে। তবে এই কয়েক দিনের শান্তি যেন কেবল স্মৃতি না হয়ে থাকে; একে স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত করতে হলে আমাদের এখনই বিকেন্দ্রীকরণের সাহসী পদক্ষেপে অংশ নিতে হবে।















