আফ্রিকার আকাশজুড়ে এখন নতুন সূর্যোদয়—বৈদ্যুতিক গাড়ির আলোয় ভরে উঠছে ভবিষ্যৎ। বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান মরডর ইন্টেলিজেন্স জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকার ইভি (ইলেকট্রিক ভেহিকল) বাজারের আকার দাঁড়াবে ৪.২ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমানে দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু বেশিরভাগ বৈদ্যুতিক যানই এখনো নির্ভর করে এমন বিদ্যুতের ওপর, যার উৎস আংশিক নবায়নযোগ্য, আংশিক জীবাশ্ম জ্বালানি।
এই বাস্তবতায় সূর্যালোকের প্রাচুর্যে ভরপুর তিউনিসিয়া থেকে উত্থান ঘটেছে নতুন এক স্বপ্নের—বাকো মোটরস নামের এক তরুণ স্টার্টআপের। তারা তৈরি করেছে এমন এক ক্ষুদ্র গাড়ি, যার ছাদজুড়ে সোলার প্যানেল। এই সৌর প্যানেল সরাসরি ব্যাটারিতে শক্তি জোগায়, ফলে সূর্যের আলোই হয়ে ওঠে গাড়ির জ্বালানি।
বাকো মোটরসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী বুবাকার সিয়ালা বলেন, “আমাদের প্রয়োজনের অর্ধেকেরও বেশি আমরা সূর্য থেকেই পাই। উদাহরণ হিসেবে, আমাদের বাণিজ্যিক ভ্যান ‘বি-ভ্যান’ দিনে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিনামূল্যে শক্তি পায়—এ বছরে প্রায় ১৭,০০০ কিলোমিটার।”
২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে তিন চাকার কার্গো যান তৈরি করেছিল, পরে চার চাকার দিকে মনোযোগ দেয়। বি-ভ্যান ৪০০ কেজি পর্যন্ত মাল বহন করতে পারে, একবার চার্জে চলে ১০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। দাম শুরু ২৪,৯৯০ তিউনিসিয়ান দিনার বা প্রায় ৮,৫০০ ডলার।
আরেকটি মডেল ‘বি’ নামের ছোট দু’আসনের গাড়ি—শহুরে যাতায়াতের জন্য উপযুক্ত, সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৪৫ কিলোমিটার, চলতে পারে ৭০ থেকে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত। দাম প্রায় ৬,২০০ ডলার। প্রতিষ্ঠানটি এখন নতুন একটি মডেল ‘এক্স-ভ্যান’ ডিজাইন করছে, যেখানে থাকবে আরও বড় কার্গো স্পেস।
প্রতিষ্ঠানের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা খালেদ হাবাইয়েব জানিয়েছেন, প্রতিটি গাড়ির ৪০ শতাংশ যন্ত্রাংশ তিউনিসিয়াতেই তৈরি হচ্ছে, যার মধ্যে ব্যাটারি ও ইস্পাতও রয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানও বাড়ছে।
বাকো মোটরসের স্বপ্ন শুধু গাড়ি বানানো নয়—তারা আফ্রিকার পরিবেশ, আলো আর মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করছে এক নতুন গতির যুগ।
আফ্রিকায় বৈদ্যুতিক গতিশক্তির প্রতিযোগিতায় এখন অনেক বড় নাম আছে—কেনিয়া ও রুয়ান্ডায় বাস পরিচালনাকারী বাসিগো, কিংবা সাতটি দেশে মোটরবাইক সরবরাহকারী স্পাইরো। কিন্তু সূর্যকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহারের কারণে বাকো মোটরস অনন্য।
আফ্রিকা ই-মোবিলিটি অ্যালায়েন্সের গবেষক বব ওয়েসোঙ্গা বলেন, “এটা অসাধারণ ধারণা। এটি শুধু গাড়ির চার্জ দীর্ঘায়িত করে না, চালকদের আত্মবিশ্বাসও বাড়ায়। অনেকেই ইভি নিতে ভয় পান—যদি চার্জ ফুরিয়ে যায়! কিন্তু সূর্যের আলো বলছে, পথ এখানেই শেষ নয়।”
বাকো মোটরস এখনো ছোট, কিন্তু তারা ইতিমধ্যে দ্বিতীয়, বৃহত্তর কারখানা নির্মাণ শুরু করেছে, যা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ চালু হবে। তাদের লক্ষ্য—প্রতি বছর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের জন্য ৮,০০০ গাড়ি উৎপাদন।
বুবাকার সিয়ালা বলেন, “আফ্রিকায় প্রতি বছর এক মিলিয়ন গাড়ির বাজার আছে। আমরা চাই এর ৫ থেকে ১০ শতাংশ আমাদের হোক।”
তার কণ্ঠে ছিল এক আশাবাদী প্রতিশ্রুতি, “আগামী পাঁচ থেকে দশ বছর হবে বৈদ্যুতিক বিপ্লবের সময়। আমাদের এখনই প্রস্তুত হতে হবে, যাতে সাধারণ আফ্রিকান নাগরিকের জন্য তৈরি করতে পারি সাশ্রয়ী, ভালো আর টেকসই যাত্রা।”
















