যুক্তরাজ্যে মেডিকেল কলেজের আসনসংখ্যা সীমিত। এই কঠোর কোটা যেন তরুণ স্বপ্নগুলোর সামনে এক অদৃশ্য প্রাচীর। সেই প্রাচীর ভাঙতেই আজ অনেকে পাড়ি জমাচ্ছেন পূর্ব ইউরোপে, বিশেষ করে বুলগেরিয়ায়।
প্রেস্টনের উনিশ বছর বয়সী ফ্রেয়া মান্দাপালি ঠিক এমনই এক স্বপ্নবালিকা। তার শিরায় বইছে চিকিৎসার রক্ত—মা-বাবা দুজনই স্থানীয় হাসপাতালে কর্মরত, বড় বোন ডাক্তার। কিন্তু যুক্তরাজ্যে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে হলে লাগে একাডেমিক উৎকর্ষ—তিনটি ‘এ’ গ্রেড, সঙ্গে উচ্চমানের রেজাল্ট। ফ্রেয়া চেষ্টা করেও তা পাননি। সাক্ষাৎকার পেলেও, শেষমেশ কোনো অফার পাননি।
এক বন্ধুর পরামর্শে তার জীবনের পথ বদলে যায়। বুলগেরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর প্লোভদিভে পড়ার প্রস্তাব এল। প্রথমে ভয় পেয়েছিলেন, কিন্তু এখন বলছেন, “শহরটা অপূর্ব, বন্ধু পেয়েছি অনেক।” দ্বিতীয় বর্ষের মেডিকেল ছাত্র ফ্রেয়া এখন নতুন জীবনের ছন্দে অভ্যস্ত।
ইংল্যান্ডে এ বছর প্রায় আট হাজারের কিছু বেশি শিক্ষার্থী চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তি হয়েছে—সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩১ সালের মধ্যে এই সংখ্যা পৌঁছাতে হবে পনেরো হাজারে। কিন্তু আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় প্রতিযোগিতা ভয়ানক, ফলে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন বিদেশের রাস্তা।
বল্টনের মোহাম্মদ আদনান প্যাটেল এখন প্লোভদিভ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে পঞ্চম বর্ষের ছাত্র। তিনিও বন্ধুর মুখে শুনে ভর্তি হন। “মা চিন্তিত ছিলেন, বাবা বলেছিলেন শক্ত হতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ভয় কেটে গেছে,” বলেন তিনি।
প্লোভদিভ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি বুলগেরিয়ার অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে আসে—গ্রিস, তুরস্ক, ইতালি, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র—কিন্তু সবচেয়ে বড় দলটি ব্রিটেন থেকেই, প্রায় ৪০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজিতে ক্লাস হওয়ায় যুক্তরাজ্যের তরুণদের আকর্ষণও বেশি।
ব্ল্যাকবার্নের ডা. মুহাম্মদ হামজা গত বছর এখান থেকে স্নাতক হয়েছেন। এখন তিনি নতুন শিক্ষার্থীদের সহায়তা করছেন MedConnect Europe নামে এক সংস্থার হয়ে। লন্ডনভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান নতুনদের থাকার জায়গা, কাগজপত্র, এমনকি ফ্লাইট বুকিং—সবকিছুতেই সাহায্য করে। “আমরা তাদের বিমানবন্দরে রিসিভ করি, হোটেলে পৌঁছে দিই, কেনাকাটা, ওয়াইফাই, সিমকার্ড—সব ব্যবস্থা করি,” বলেন হামজা।
তিনি এখন চোরলির এক ডেন্টাল ক্লিনিকে কাজ করেন। “বুলগেরিয়ায় হাতে-কলমে কাজের সুযোগ অনেক বেশি। তাই যুক্তরাজ্যে এসে কাজ শুরু করা সহজ হয়ে যায়,” জানান তিনি।
তবে এই পথ মোটেও সহজ নয়। ক্লাস শুরু হয় সকাল সাড়ে সাতটায়, শেষ হয় সন্ধ্যা ছয়টায়। পাশাপাশি শেখা লাগে বুলগেরিয়ান ভাষা, কারণ শেষ তিন বছরে স্থানীয় রোগীদের সেবা দিতে হয়। বুলগেরিয়ান ভাষা রুশ ভাষার মতোই সিলিরিক বর্ণমালা ও জটিল ব্যাকরণে গঠিত।
ভাষা শিক্ষিকা মিলেনা মুলেশকোভা বলেন, “প্রথম বছরে আমরা শেখাই দৈনন্দিন কথা বলার ভাষা, দ্বিতীয় বছরে চিকিৎসা বিষয়ক শব্দভাণ্ডার।”
বুলগেরিয়ায় চিকিৎসাশিক্ষা ছয় বছরের—যুক্তরাজ্যের চেয়ে এক বছর বেশি। তবে শেষমেশ এই ডিগ্রি ব্রিটেনের জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিল কর্তৃক স্বীকৃত, ফলে NHS-এ কাজ করা যায় কোনো বাড়তি পরীক্ষার প্রয়োজন ছাড়াই।
তবে ২০২৮ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ব্রিটেনের চুক্তি পর্যালোচনার সময় এই নিয়ম বদলাতে পারে—যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
এখন NHS নিরপেক্ষভাবে দেশি-বিদেশি আবেদনকারীদের বিবেচনা করে, কিন্তু যুক্তরাজ্যের ডাক্তারদের সংগঠন চায় দেশীয় শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হোক। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংও তাতে একমত। ফলে বিদেশে পড়া ব্রিটিশ শিক্ষার্থীরাও “আন্তর্জাতিক মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট” হিসেবে কম অগ্রাধিকার পেতে পারেন।
মোহাম্মদ আদনান প্যাটেল বলেন, “এটা বেশ উদ্বেগের। আলোচনাটা প্রতিদিনই চলে। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।”
তবুও বিশ্বজুড়ে চিকিৎসক সংকট দিন দিন বাড়ছে। ২০২৩ সালে NHS-এ যোগ দেওয়া নতুন ডাক্তারদের মধ্যে ৬৮ শতাংশই বিদেশি। একইসঙ্গে অনেক ব্রিটিশ ডাক্তার চলে যাচ্ছেন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে।
ডা. হামজা বলেন, “ডাক্তার আর দন্তচিকিৎসকের চাহিদা কেবল যুক্তরাজ্যে নয়, বিশ্বজুড়েই বাড়ছে। এই প্রবণতা কমবে না, বরং আরও ছড়াবে।”
তরুণদের চোখে তাই বুলগেরিয়া আজ এক নতুন স্বপ্নের নাম—এক দূরদেশ, যেখানে অসম্পূর্ণ স্বপ্নগুলো নতুন ভাষা, নতুন আলোয় আবার জন্ম নিচ্ছে।
















