ভয় আজ যেন এক শিল্পে পরিণত হয়েছে। এক নতুন যুগের পেশা—“ডুমারিজম”—যেখানে প্রতিদিনই নতুন নতুন ভবিষ্যদ্বক্তারা উঠে আসছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করছেন। তাঁদের ভাষা ধ্বংসের, তাঁদের যুক্তি ইতিহাসের ধুলোমলিন পাতা থেকে ধার করা। তারা আবারও তুলছে সাউথ সি বাবল, রেলওয়ে ম্যানিয়া, কিংবা ডট-কম ধসের নাম। বার্তা একটাই—সব শেষ হয়ে যাবে।
বাজার বিশ্লেষণের নামে এই “অপোক্যালিপসের কোরাস” এখন সর্বত্র। কেউ বলছেন ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার উবে যাবে, কেউ বলছেন ১৯২৯-এর মতো আরেক বিশ্বমন্দা আসন্ন। আর এই প্রতিযোগিতা যেন কে সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য আঁকতে পারে, তারই লড়াই।
এইসব বিশ্লেষকেরা নিজেদের ভাবেন মরুভূমির একাকী ভবিষ্যদ্বক্তা। অথচ বাস্তবে তাঁরা ভিড়ে ঠাসা। আজ এমন কোনো আর্থিক ব্লগ বা ম্যাগাজিন নেই যেখানে ইতিহাসের ভুতেরা ঠাঁই পায়নি। ভয় বিক্রি হয়, এবং ভালোই বিক্রি হয়। নতুন প্রযুক্তির সাত পাপ নিয়ে লেখা প্রবন্ধ হয়তো লাখোবার পড়া হয়, কিন্তু তার বিপরীতে “সাতটি গুণ” নিয়ে লেখা পড়ে না কেউ।
কিন্তু ইতিহাসের কাচের জানালায় সবসময় একই দৃশ্য দেখা যায় না। অতীতকে অস্ত্র বানিয়ে আজকের পৃথিবী বোঝার চেষ্টা এক বিপজ্জনক অলসতা। ইতিহাস শুধু পথ দেখায় না, মাঝে মাঝে পথভ্রষ্টও করে।
সবচেয়ে বড় ভুল হলো কল্পনার অভাব। অতীতের ভবিষ্যদ্বক্তারা যেমন ভুল করেছিলেন, তেমনি আজকের এআই সমালোচকেরাও সেই একই ফাঁদে পড়ছেন। একসময় কেউ বলেছিল, “৬৪০ কিলোবাইট মেমোরিই যথেষ্ট”—আজ সেটি কৌতুক। কেউ ভেবেছিল ঘরে কম্পিউটার রাখার কোনো দরকার নেই, কেউ বলেছিল টেলিফোন হবে “খেলনা”, কেউ মনে করেছিল গাড়ি কখনো ঘোড়ার বিকল্প হতে পারবে না। ইতিহাসে এই ভুলদের ছায়া এখনো ঘুরে বেড়ায়—ডিইসি, আইবিএম, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো হারিয়ে গেছে কল্পনার ঘাটতির কারণে।
আজ যাঁরা এআইকে “স্ট্যাটিস্টিকাল প্যারট” বলে তুচ্ছ করছেন, তাঁরাও হয়তো সেই পুরোনো ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করছেন। তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন, মাত্র দু’বছরে জেনারেটিভ এআই পৃথিবী বদলে দিয়েছে—২০২২-এ যেখানে টোকেন প্রসেসিং ছিল নগণ্য, ২০২৪-এ গুগল এক মাসেই ১.৪ কোয়াড্রিলিয়ন টোকেন প্রক্রিয়াকরণ করেছে। আর এই প্রবাহ আগামী দশকে শতগুণ বাড়তে পারে।
এই পরিবর্তন কোনো “টিউলিপ ম্যানিয়া” নয়, কোনো “রেলওয়ে উন্মাদনা” নয়—এটি পরিকাঠামোগত বিপ্লব। জেনারেটিভ এআই শুধু টুল নয়, এটি মানব বুদ্ধির নতুন স্তর, যেখানে ওষুধ উদ্ভাবন, আইন বিশ্লেষণ, বিজ্ঞান ও কোডিং—সবকিছু নতুনভাবে রচিত হচ্ছে।
এই প্রযুক্তির দিকে যারা কেবল ভয় নিয়ে তাকাচ্ছেন, তারা আসলে ইতিহাসের মতোই ভুল দৃষ্টিতে বর্তমানকে মাপছেন।
ডুমাররা এখন বলছেন, সার্ভার ফাঁকা পড়ে আছে, অতিরিক্ত নির্মাণ হচ্ছে—এক বিশাল বুদবুদের দিকেই এগোচ্ছে বিশ্ব। কিন্তু তারা ভুলে যান, ক্ষমতা ও সুরক্ষা কোনো “শেয়ারড ইউটিলিটি” নয়। যে দেশে, যে কোম্পানির হাতে থাকবে এই কম্পিউটিং শক্তি, তারাই টিকে থাকবে। অন্যের কম্পিউটের ওপর নির্ভরতা আজ নতুন ঝুঁকি। অতিরিক্ত ক্ষমতা মানে অপচয় নয়—মানেই বেঁচে থাকা।
এআই বিপ্লব কোনো ধাপে ধাপে উন্নয়ন নয়—এটি ধরণের পরিবর্তন। সিপিইউ থেকে জিপিইউ-র দিকে এই ঝাঁপ যেমন ইতিহাসে আর হয়নি, তেমনি এই পরিবর্তনের গতি আগের সব প্রযুক্তিগত যুগকে ছাপিয়ে গেছে। এ যেন ভূমিকম্পের মতো—৯.১ মাত্রার এক বিশ্ব কাঁপন।
ডুমারদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো তারা ইতিহাসকে একরৈখিকভাবে পড়ে। তারা দেখে শুধু পতনের কাহিনি—সাউথ সি বাবল, টিউলিপ ম্যানিয়া, ডটকম ধস। কিন্তু তারা ভুলে যায়—এই পতনের মাঝেই লুকিয়ে ছিল নবজন্মের বীজ। ব্রিটিশ সরকার সেই বাবল ব্যবহার করেছিল নিজের ঋণ পুনর্গঠনে, “নিফটি ফিফটি” নামে পরিচিত সেই অতিমূল্যায়িত কোম্পানিগুলোর মধ্যেই ভবিষ্যতের জায়ান্টরা লুকিয়ে ছিল, আর জাপানের দীর্ঘমেয়াদি উত্থান তো ডুমারদের ভবিষ্যদ্বাণীকেই মিথ্যে প্রমাণ করেছিল।
আজকের বিশ্বে সরকারগুলোও আর আগের মতো নয়। ১৭২০ বা ১৯২৯-এর মতো তারা ধ্বংসের দিকে চেয়ে থাকে না, হাত গুটিয়ে। ২০০৮ তাদের শিখিয়েছে—সিস্টেমিক ধস রাজনীতির মৃত্যুঘণ্টা। তাই এখন তাদের হাতে সর্বদা আগুন নেভানোর পাইপ প্রস্তুত। বাজার ধসে পড়লে তারা অর্থ ঢালে, সুদের দরজা খোলে, কারণ তারা জানে—এই লড়াই শুধু অর্থনীতির নয়, সার্বভৌমত্বেরও।
এআই আজ শুধুমাত্র এক শিল্প নয়, এটি জাতীয় শক্তির প্রতীক। কোনো দেশই তার প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব হারানোর ঝুঁকি নিতে পারবে না। তাই সম্ভাব্য ধসের ভয় থাকলেও, বাস্তব ভয় অন্য জায়গায়—পিছিয়ে পড়ার ভয়।
আমরা জানি, বাজারে ফোলাভাব আছে, আশা অতিরিক্ত। ধসও আসবে, ব্যথাও হবে। কিন্তু সবকিছুর মধ্যেও এক সত্য উজ্জ্বল—এই সময়টি অনন্য। ভয় নয়, কৌতূহল দরকার; ইতিহাস নয়, কল্পনা দরকার।
যারা আজ ভয় বিক্রি করছেন, তারা হয়তো আগামী প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠবেন নতুন ইতিহাসের হাসির গল্প। যেমন একসময় হয়েছিল ডিইসি বা ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন।
এই পৃথিবী এখন এমন এক দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, যেখানে ভুল করাও সাহস। কিন্তু না করা, স্থির থাকা—সেটিই সবচেয়ে বড় ভুল। কারণ ভবিষ্যৎ তৈরি হয় তাদের হাতেই, যারা ভয় পায় না।
















