বিশ্বে প্রথমবারের মতো বছরে দু’বার নেওয়া যায় এমন এইচআইভি প্রতিরোধী ইনজেকশন ‘লেনাকাপাভির’ চালু করতে যাচ্ছে জিম্বাবুয়ে। দেশটি বিশ্বের ১০টি দেশের মধ্যে একটি, যেখানে পরীক্ষামূলকভাবে এই ওষুধ প্রয়োগ শুরু হচ্ছে। তবে এ উদ্যোগকে ঘিরে দেশটিতে খরচ, নিরাপত্তা ও প্রাপ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
মার্কিন প্রতিষ্ঠান গিলিয়াড সায়েন্সেস তৈরি করেছে লেনাকাপাভির, যার বাজারজাত নাম ‘ইয়েজটুগো’। হারারে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, “এইচআইভি মোকাবিলায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে জিম্বাবুয়ে নির্বাচিত হওয়ায় আমরা আনন্দিত।”
জাতিসংঘের এইচআইভি কর্মসূচি ইউএনএইডসের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত। সম্প্রতি জিম্বাবুয়ে ইউএনএইডসের ৯৫–৯৫–৯৫ লক্ষ্য অর্জন করেছে—যেখানে ৯৫ শতাংশ আক্রান্ত ব্যক্তি জানেন তারা এইচআইভি পজিটিভ, তাদের ৯৫ শতাংশ চিকিৎসাধীন এবং তাদের মধ্যে ৯৫ শতাংশের ভাইরাল লোড নিয়ন্ত্রিত।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ পোনেসাই নিয়িকা বলেন, “জিম্বাবুয়ের এইচআইভি মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী কাঠামো রয়েছে। পেপফারসহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা লেনাকাপাভির প্রবর্তনে বড় সহায়তা দেবে।”
দেশটির নতুন এ ইনজেকশন মূলত এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা কিশোরী, গর্ভবতী নারী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রয়োগ করা হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই ওষুধটিকে এইচআইভি প্রতিরোধে এক “বিপ্লবী অগ্রগতি” বলে উল্লেখ করেছে। সংস্থার মহাপরিচালক টেডরোস আধানম গেব্রেয়েসুস বলেন, “এইচআইভির টিকা না থাকলেও লেনাকাপাভির সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রায় শতভাগ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ।”
ইউএনএইডসের উপপরিচালক অ্যাঞ্জেলি আক্রেকার একে “অলৌকিক ওষুধ” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “এটি প্রায় ১০০ শতাংশ কার্যকর, যা অভূতপূর্ব সাফল্য। টিকা বা নিরাময় না থাকলেও এটি এখন পর্যন্ত সেরা বিকল্প।”
২০২৭ সালের মধ্যে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ১২০টি দেশে লেনাকাপাভির চালু করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বছরে ১৩ লাখ নতুন সংক্রমণ রোধে এটি বড় ভূমিকা রাখবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, সাব-সাহারান আফ্রিকায় নারী ও কিশোরীদের ওপর এবং যুক্তরাষ্ট্রে সমকামী পুরুষ ও ট্রান্সজেন্ডার নারীদের ওপর চালানো দুইটি ট্রায়ালেই ওষুধটি ৯৯ শতাংশের বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
তবে ওষুধটি ঘিরে জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ এটিকে আশার আলো হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ সন্দিহান খরচ ও প্রাপ্যতা নিয়ে।
নিয়িকা বলেন, “প্রতিটি নতুন ওষুধের মতো এরও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, কিন্তু বিদ্যমান তথ্য অনুযায়ী এটি নিরাপদ ও সহনশীল।” তিনি আরও বলেন, “ওষুধের নিরাপত্তা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছভাবে জানানো হলে জনগণের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।”
তবে দাম নিয়ে উদ্বেগ থেকেই গেছে। লেনাকাপাভিরের বার্ষিক খরচ বর্তমানে প্রায় ৪০ ডলার নির্ধারিত হলেও প্রাথমিকভাবে এটি ২৮ হাজার ডলার পর্যন্ত ছিল।
ওষুধটি শুরুতে মুখে খাওয়ার দুটি ডোজ নেওয়ার পর ইনজেকশন হিসেবে প্রয়োগ করতে হয়।
নিয়িকা মনে করেন, মধ্যম ও নিম্ন আয়ের দেশগুলো পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে দাম কমাতে পারে। আঞ্চলিক উৎপাদন এবং বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা কাজে লাগালে সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
পেপফার ও গ্লোবাল ফান্ডের সহায়তায় এই ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জিম্বাবুয়ের পাশাপাশি কেনিয়া, নাইজেরিয়া, জাম্বিয়া, উগান্ডা, তানজানিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, এসওয়াতিনি ও বতসোয়ানাতেও ২০২৬ সালের জানুয়ারি নাগাদ লেনাকাপাভির চালু করা হবে।
















