মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে নিজেদেরকে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে চাচ্ছে পাকিস্তান। অস্ত্র রপ্তানি ও সামরিক চুক্তির মাধ্যমে দেশটির কৌশলগত উপস্থিতি বাড়লেও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
চলতি ফেব্রুয়ারির শুরুতে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের সামরিক নেতা খলিফা হাফতার পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে সফর করেন। এই সফর ছিল পাকিস্তানের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় বাড়তে থাকা প্রতিরক্ষা কূটনীতির একটি ইঙ্গিত। বিভিন্ন সূত্রের মতে, পাকিস্তান হাফতারের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সঙ্গে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, যার আওতায় জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান ও প্রশিক্ষণ বিমান সরবরাহের কথা রয়েছে।
এ ছাড়া সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের আরেকটি অস্ত্রচুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে ইসলামাবাদ। এই চুক্তিতে হালকা আক্রমণকারী বিমান, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের কথা বলা হচ্ছে, যা দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধে সামরিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব চুক্তি পাকিস্তানের জন্য নতুন বৈদেশিক মুদ্রার উৎস, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্ন থেকে যায়—এই তৎপরতা কি কেবল অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রিকেন্দ্রিক, নাকি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা প্রদানের একটি সুসংহত কৌশলের অংশ। কারণ অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ, সীমান্ত উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতাকে বারবার দেশের ভেতরেই ব্যস্ত করে রাখছে।
২০২৫ সালের ভারত–পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনার পর পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর কার্যকারিতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় আসে। এতে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রতি কিছু মধ্যপ্রাচ্য দেশের আগ্রহ বেড়েছে। একই ধারাবাহিকতায় সৌদি আরবের সঙ্গে একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে, যেখানে এক পক্ষের ওপর হামলাকে অন্য পক্ষের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু সামরিক সহযোগিতার বাইরে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ভারতের তুলনায় অনেক কম। পাকিস্তান এখনো মূলত ঋণ ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে ভারত ওই অঞ্চলে বড় বিনিয়োগকারী ও বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
এই অর্থনৈতিক ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে বৃহত্তর অংশীদারত্বের একটি অংশ হিসেবে দেখে—যার মধ্যে জ্বালানি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো বিনিয়োগও অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের নিজস্ব নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ‘নিরাপত্তা রপ্তানিকারক’ ভাবমূর্তির পথে বড় বাধা। সাম্প্রতিক সময়ে বেলুচিস্তানে ব্যাপক সহিংসতায় নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে। রাজধানীর কাছাকাছি আত্মঘাতী হামলায়ও বহু মানুষ নিহত হয়েছে। পাশাপাশি আফগানিস্তান সীমান্তে জঙ্গি তৎপরতা ঠেকাতে গিয়ে বড় ধরনের সামরিক সম্পদ ব্যয় করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা কূটনীতি দেশটির জন্য সুযোগ বয়ে আনতে পারে, তবে টেকসই প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, সুস্পষ্ট নিরাপত্তা নীতি এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি। শুধু অস্ত্র বিক্রি নয়, নিরাপত্তা প্রদানের বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে তুলতে হলে এই সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতি জরুরি।
















