জামায়াতের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ—খোমেনির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাস কি পুনরাবৃত্তি হতে পারে?
১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনি গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে কীভাবে ইরানে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন—সেই ইতিহাস থেকে বাংলাদেশের জন্য কোন শিক্ষা রয়েছে, বিশেষত যখন জামায়াত ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থানে?
১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী দেশ ত্যাগ করার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ইরানের তেহরানে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। তাদের স্বপ্ন ছিল গণতন্ত্র, স্বাধীনতা আর সুশাসন। কিন্তু ৪৭ বছর পর আজকের ইরানের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন—সেখানে চলছে ভয়ঙ্কর স্বৈরশাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই, নারীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ।
বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষমতার কাছাকাছি চলে আসার প্রেক্ষাপটে ইরানের সেই ইতিহাস নতুন করে আলোচনায় উঠে আসছে। প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি একই ধরনের ঐতিহাসিক পরিণতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে?
খোমেনির প্রতিশ্রুতি ও বিশ্বাসঘাতকতা
ইসলামী বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের প্রথম প্রেসিডেন্ট আবুলহাসান বনি-সদর তার মৃত্যুর আড়াই বছর আগে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে এক সাক্ষাৎকার দেন। ২০১৯ সালের শুরুতে ফ্রান্সের প্যারিস উপকণ্ঠ ভার্সাইতে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে বনি-সদরকে খুব বিষণ্ণ দেখায়।
বনি-সদরের বর্ণনায় উঠে আসে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতা দখলের পর কীভাবে বিপ্লবের নীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। বনি-সদর মনে করেন, নির্বাসিত জীবন শেষে বিদেশ থেকে খোমেনিকে তেহরানে ফিরিয়ে আনা হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে তিনি যে ধোঁকা দিয়েছেন, তা বিপ্লবীদের মাঝে খুব কটু স্বাদ রেখে গেছে।
বনি-সদর রয়টার্সকে বলেন, “ফ্রান্সে অবস্থানকালে খোমেনি সবসময় মুক্ত গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন। পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের কাছে খোমেনি এমন একটি আধুনিক ইসলামের ব্যাখ্যা সমর্থন করছেন বলে মনে হচ্ছিল, যেখানে ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা রাখা হয়।”
কিন্তু বিমান থেকে ইরানে নামার পরপরই খোমেনি বদলে যান। হাজার বছরের ঐতিহ্যে গড়া সেক্যুলার ইরানে জেঁকে বসে মোল্লাতন্ত্র।
প্যারিস থেকে তেহরান: একটি রূপান্তরের গল্প
বিপ্লবের আগে আয়াতুল্লাহ খোমেনি ও বনি-সদর দুজনই প্যারিসে নির্বাসনে ছিলেন। শাহ রাজবংশের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি খোমেনি ইরান ত্যাগ করেন। প্রথমে তুরস্কে যান, সেখান থেকে ইরাক। শেষ পর্যন্ত প্যারিসের বাইরের একটি গ্রামের সাধারণ বাড়িতে স্থায়ী হন। সেখান থেকেই তিনি ইরানের ইসলামপন্থী বিপ্লবের ভিত্তি গড়েন।
ইরানের তৎকালীন এক শিয়া ধর্মগুরুর ছেলে বনি-সদর তখন প্যারিসে অর্থনীতির ছাত্র। ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্কের কারণে বনি-সদর খোমেনিকে কেবল ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে সহযোগিতাই করেননি, পরবর্তীকালে তিনি খোমেনির একজন ঘনিষ্ঠ সহচর ও সহকর্মী হয়ে ওঠেন।
১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে খোমেনির আশীর্বাদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন বনি-সদর। কিন্তু দেড় বছরের মাথায় খোমেনিই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ১৯৮১ সালে ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন এবং ২০২১ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই নির্বাসিত ছিলেন।
খোমেনির প্রতিশ্রুতি: ৪৭ বছর পরের বাস্তবতা
বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়ার দুই মাস পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তার রাজনৈতিক দর্শনের কিছু দিক তুলে ধরেন। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে পশ্চিমাদের সমালোচনা করে তিনি ঘোষণা দেন, ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত ইরানের নতুন ব্যবস্থা প্রমাণ করবে যে, একমাত্র ইসলামী গণতন্ত্রই সঠিক।
তিনি দাবি করেন, ইসলামে কোনো দমন-পীড়ন নেই এবং ইসলামী সরকার অন্যায় করে না। তিনি ঘোষণা দেন, “আজ ইরানে যা কিছু আছে, সবই পরিবর্তন করতে হবে।”
কিন্তু তার এই ভাষণের ৪৭ বছর পর আজকের ইরানের দিকে তাকালে দেখা যায় সেখানে চলছে ভয়ঙ্কর স্বৈরশাসন। মত প্রকাশের কোনো স্বাধীনতা নেই। হাজার হাজার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীকে খুন করা হচ্ছে। অর্থনীতির অবস্থা শোচনীয়। নারীদের কোনো সম্মান নেই।
বাংলাদেশে জামায়াতের উত্থান: নজিরবিহীন পরিস্থিতি
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জামায়াতে ইসলামী রীতিমতো ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে জামায়াত দ্রুত নিজেকে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
যদি ঘটনাচক্রে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হয়ে যায়, তবে এটি হবে দলটির জন্য নাটকীয় প্রত্যাবর্তন—যে দলটি বাংলাদেশের জন্মের কেবল বিরোধিতাই করেনি, ১৯৭১ সালে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের সঙ্গী হয়েছে।
জরিপে চমকপ্রদ ফলাফল
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট’ (IRI)-এর এক জরিপে দেখা গেছে, বিএনপির জনসমর্থন যেখানে ৩৩ শতাংশ, সেখানে জামায়াত ২৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। অন্য একটি জরিপেও একই ধরনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে; সেখানে ৩৪.৭ শতাংশ সমর্থন নিয়ে বিএনপি শীর্ষে থাকলেও জামায়াতের অবস্থান ছিল ৩৩.৬ শতাংশে।
এই তথ্য ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ পর্যবেক্ষক মনে করেন, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। ওই চারটি নির্বাচনে জামায়াত সর্বোচ্চ ১২.১৩ শতাংশ (১৯৯১) এবং সর্বনিম্ন ৪.২৮ শতাংশ (২০০১) ভোট পেয়েছিল।
এ যাবৎ অনুষ্ঠিত ১২টি নির্বাচনে জামায়াত কখনোই ১৮টির বেশি সংসদীয় আসনে জয়ী হতে পারেনি। সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমান জরিপের ফলাফল একটি নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শফিকুর রহমানের আশ্বাস ও উদ্বেগ
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বারবার বলছেন যে, তারা নির্বাচিত হলে বাংলাদেশে ইসলামী শাসনব্যবস্থা নয়, বরং কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। তার এই কথায় অনেকেই আশ্বস্ত হতে পারছেন না।
কারণ ১৯৪০-এর দশকের শুরুতে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি প্যান-ইসলামিস্ট আন্দোলনে বিশ্বাস করে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মতো ভারতে রয়েছে জামাত-ই-ইসলামী হিন্দ, পাকিস্তানে আছে জামায়াত-ই-ইসলামী পাকিস্তান আর আফগানিস্তানে সক্রিয় জামিয়াত-ই-ইসলামী। সবগুলো দলই এক সূত্রে গাঁথা।
কয়েকদিন আগে শফিকুর রহমান বলেছেন যে, তারা প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র মদিনার আদলে বাংলাদেশে ইসলামী নীতির ভিত্তিতে একটি সমাজ গঠন করতে চান। এ কথা মনে রাখা দরকার, শফিকুর রহমান কিন্তু দলের সভাপতি বা চেয়ারপারসন নন; তিনি ‘আমির’, যার প্রতিশব্দ ‘কমান্ডার’।
মওদূদীর স্বপ্ন ও জামায়াতের আদর্শ
জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করে সমগ্র ভারতকে ‘দারুল ইসলামে’ রূপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করা প্রথম মুসলমানদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে মওদূদী ইসলামিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন।
এই দলগুলোর সব সদস্য বিশ্বাস করেন, ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য যারা কাজ করে তারা কেবল বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানে থামবে না। ইসলামের বিপ্লবী ধারণার ওপর ভিত্তি করে সারা মানবজাতির মধ্যে ব্যাপক বিপ্লবকে তারা প্রভাবিত করবে।
বাংলাদেশের সমাজে ইসলামপন্থী ধারা
সন্দেহ নেই, বাংলাদেশি সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইসলামপন্থী ধারার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দেশজুড়ে ধর্মভীরুতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলামের রক্ষণশীল ব্যাখ্যা অধিকতর গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে জামায়াতে ইসলাম ইসলাম নয়, এমনটাই অধিকাংশ মানুষ মনে করেন। বাস্তবতা এই যে, একটি আন্তঃআঞ্চলিক ইসলামপন্থী আন্দোলন থেকে বিকশিত হয়ে জামায়াত বাংলাদেশে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
জামায়াতের একজন শীর্ষ নেতা সম্প্রতি আল জাজিরাকে বলছিলেন, তাদের আনুমানিক দুই কোটি সমর্থক রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার নিবন্ধিত সদস্য আছেন, যাদের ‘রুকন’ বলা হয়।
ইরানের পথে বাংলাদেশ?
ঘরপোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ মনে করে—ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী বিজয়ী হলে তাদের ভাগ্যে জুটবে ঘোর অমানিশা।
জামায়াত-নেতৃত্বাধীন কোনো জোট যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরের একটি বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ একটি ইসলামপন্থী শক্তির নেতৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত কি না—সে প্রশ্ন নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এমন নেতৃত্ব শরিয়াহ আইন প্রয়োগের চেষ্টা করতে পারে, যেখানে নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে বাধ্য। আগামী নির্বাচনের পর বাংলাদেশ বর্তমান ইরানের পথে যাত্রা করে কিনা, এ নিয়ে অনেকেই আতঙ্কিত।
ইতিহাসের এই সতর্কবার্তা বাংলাদেশের ভোটাররা কতটা গুরুত্ব দিয়ে নেবেন, তা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে স্পষ্ট হবে।
















