খনি থেকে ‘ইয়েলো কেক’, সেখান থেকে জ্বালানি—ইউরেনিয়ামের পথ জটিল, নিয়ন্ত্রিত ও ব্যয়বহুল
ইউরেনিয়াম নিয়ে আবেগতাড়িত বক্তব্য নয়, দরকার তথ্যভিত্তিক বোঝাপড়া—এটি ভূতত্ত্ব, জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর একটি খাত, যেখানে ভুল তথ্য জনমতকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
ইউরেনিয়াম নিয়ে সাম্প্রতিক জনআলোচনাকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এই মৌলটি আসলে কতটা সহজলভ্য, কীভাবে এটি জ্বালানিতে রূপ নেয় এবং কেন এটি এত কড়া আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরেনিয়ামকে সাধারণ খনিজ সম্পদের মতো ভাবা ভুল; এটি একই সঙ্গে বিজ্ঞান, অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতির বিষয়।
প্রকৃতিতে ইউরেনিয়াম তুলনামূলক সুলভ হলেও অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য ভাণ্ডার সীমিত। অনেক জায়গায় উপস্থিতি থাকলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক চুক্তির কারণে উত্তোলন সম্ভব হয় না। বাংলাদেশেও উপকূলীয় অঞ্চলে তেজস্ক্রিয় খনিজের সম্ভাবনার কথা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, তবে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য নিশ্চিত ভাণ্ডার নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা নেই।
আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ ও এনপিটি
ইউরেনিয়াম উত্তোলন বা সরবরাহ কেবল জাতীয় সিদ্ধান্তে সম্ভব নয়। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার নজরদারি এ খাতকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। একটি খনি পরিকল্পনা থেকে উৎপাদনে যেতে উন্নত দেশেও প্রায় এক দশক সময় লেগে যায়।
বিশ্বের মজুদ ও উৎপাদন
বিশ্বে অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য ইউরেনিয়ামের বড় অংশ অস্ট্রেলিয়া, কাজাখস্তান, কানাডা, রাশিয়া ও নামিবিয়ায় রয়েছে। উৎপাদনে শীর্ষে কাজাখস্তান, এরপর কানাডা ও নামিবিয়া। কয়েকটি দেশ মিলে বৈশ্বিক উৎপাদনের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে।
অন্যদিকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে শীর্ষ ব্যবহারকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও চীন। বিশ্বে শত শত পারমাণবিক চুল্লি চালু রয়েছে এবং আরও অনেক নির্মাণাধীন। বাংলাদেশেও রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ চলছে।
জ্বালানিতে রূপ নেওয়ার ধাপ
ইউরেনিয়াম জ্বালানিতে রূপ নিতে চারটি প্রধান ধাপ পেরোয়: আকরিক উত্তোলন, রূপান্তর, সমৃদ্ধকরণ ও পুনর্ব্যবহার। খনি থেকে আনা আকরিক প্রক্রিয়াজাত হয়ে ‘ইয়েলো কেক’ হয়। এরপর তা রাসায়নিকভাবে রূপান্তর করে গ্যাসীয় যৌগে নেওয়া হয়, যাতে আইসোটোপ আলাদা করা যায়।
প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে ইউরেনিয়াম-২৩৫ থাকে মাত্র প্রায় ০.৭ শতাংশ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এটি সাধারণত ৩–৫ শতাংশে সমৃদ্ধ করা হয়। এরপর পেলেট ও ফুয়েল রড তৈরি করে চুল্লিতে ব্যবহার করা হয়। ব্যবহারের পর জ্বালানির কিছু অংশ পুনর্ব্যবহারও সম্ভব।
অস্ত্র বনাম বিদ্যুৎ
পারমাণবিক বোমার জন্য ৯০ শতাংশ বা তার বেশি ইউরেনিয়াম-২৩৫ দরকার, যা প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। এ কারণে আন্তর্জাতিক নজরদারি কঠোর। বিশেষজ্ঞরা জোর দেন, ইউরেনিয়ামের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার—বিদ্যুৎ উৎপাদন—নিয়েই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
দায়িত্বশীল আলোচনার আহ্বান
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরেনিয়াম নিয়ে না বুঝে আতঙ্ক ছড়ানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি অতিসরলীকরণও ক্ষতিকর। প্রযুক্তিগত বিষয় জনপরিসরে তুলতে হলে তথ্যনির্ভর ও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। কারণ ভুল তথ্য জনমতকে বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকেও প্রভাবিত করতে পারে।















