অভিযোগকে ‘কৌশল’ বলছে বড় দলগুলো; মানবাধিকার ও জাতীয় ইস্যুতে প্রার্থীদের নীরবতায় ক্ষোভ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করলেও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে এনসিপি’র পক্ষ থেকে নির্বাচনি মাঠে ভয়ভীতির অভিযোগ তোলা হলেও একে কেবল ‘রাজনৈতিক কৌশল’ হিসেবে দেখছে বিএনপি ও জামায়াতের মতো বড় দলগুলো। এরই মধ্যে নির্বাচনি প্রচারণায় যুক্ত হয়েছে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ‘দেশ ছেড়ে পালানো’র পাল্টাপাল্টি বয়ান। এক পক্ষ যখন পিন্ডি বা দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার খোঁচা দিচ্ছে, অন্য পক্ষ তখন দেশে থেকে জেল-জুলুম সহ্য করার দাবি তুলছে। তবে বিস্ময়করভাবে প্রচারণায় অনুপস্থিত রয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিশ্বকাপ বর্জন বা সাম্প্রতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের মৌলিক সংকট পাশ কাটিয়ে ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়ি গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মতে, এখন পর্যন্ত বড় ধরণের কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা নির্বাচনি আদালত বা স্থানীয় প্রশাসনকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছে কমিশন।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড: অভিযোগ ও পাল্টাপাল্টি যুক্তি
নির্বাচনি মাঠে সমান সুযোগ নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে:
- নাহিদ ইসলামের অভিযোগ: ঢাকা-১১ আসনের এনসিপি প্রার্থী নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন যে, এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি এবং তাদের কর্মীদের ভয় দেখানো হচ্ছে। তিনি ১২ ফেব্রুয়ারিকে ‘দখলবাজদের শেষ দিন’ হিসেবে অভিহিত করেন।
- বিএনপির পাল্টা যুক্তি: বিএনপির শামসুজ্জামান দুদু এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে বলেন, “বর্তমান সরকার তরুণদেরই সরকার। পরাজয় আঁচ করতে পেরে এটি কোনো বিশেষ কৌশল কি না, তা দেখার বিষয়।”
‘দিল্লি বনাম পিন্ডি’: পাল্টাপাল্টি খোঁচা
প্রচারণায় রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে কে দেশে ছিলেন আর কে পালিয়েছেন—সেই বিতর্ক এখন তুঙ্গে:
১. ডা. শফিকুর রহমান (জামায়াত): গাইবান্ধায় এক জনসভায় তিনি বলেন, “স্বৈরাচারের চরম জুলুমের মুখেও জামায়াত নেতাকর্মীরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি, মানুষের পাশেই ছিলেন।”
২. তারেক রহমান (বিএনপি): হবিগঞ্জের সমাবেশে তিনি পাল্টা আক্রমণ করে বলেন, “কিছু লোক বিপদে পড়লে দিল্লি যান, কেউ যান পিন্ডি। কিন্তু খালেদা জিয়া মৃত্যুকে মেনে নিয়ে লড়াই করেছেন, দেশ ছাড়েননি।”
জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে রহস্যময় নীরবতা
নির্বাচনি প্রচারণায় প্রার্থীরা যে বিষয়গুলো এড়িয়ে যাচ্ছেন:
- জাতীয় মর্যাদাহানি: টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের বাদ পড়া বা আইসিসির সঙ্গে বর্তমান টানাপোড়েন নিয়ে কোনো দলেরই স্পষ্ট অবস্থান নেই।
- মানবাধিকার ও মানবিকতা: কারাগারে থাকা সাবেক ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী ও ৯ মাসের শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় প্যারোলে মুক্তি না দেওয়ার মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে রাজনীতিবিদরা সম্পূর্ণ চুপ।
- অর্থনৈতিক সংকট: সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তোলা দ্রব্যমূল্য বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয়গুলো প্রচারণার মূল স্রোতে জায়গা পাচ্ছে না।
মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকে নীতিনির্ভর প্রক্রিয়ার চেয়ে ক্ষমতার কৌশলগত প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছে। সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সতর্ক করে বলেন, “ব্যক্তিগত আক্রমণ কর্মী পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। নেতাদের উচিত সুস্থ বিতর্কের মাধ্যমে জনমানুষের সমস্যার সমাধান দেওয়া।”
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ৩০০টি ইলেক্টরাল কমিটির মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে নিবিড় নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
















