হাসিনাহীন আওয়ামী ভোটব্যাংক টানতে বিএনপি-জামায়াতের নমনীয় সুর; নির্বাচনের মাঠে ‘তলে তলে’ চলছে দেনদরবার
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও সাংগঠনিকভাবে নিষিদ্ধ হলেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় দলগুলোর প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ‘ভোটব্যাংক’। নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ প্রায় সব দলের প্রার্থীরা আওয়ামী সমর্থকদের ভোট নিজেদের দিকে টানতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। মাঠ পর্যায়ের নির্বাচনি জনসভাগুলোতে এখন আর কেবল সমালোচনাই নয়, বরং ‘নিরপরাধ’ আওয়ামী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন হেভিওয়েট প্রার্থীরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের নিজস্ব কোনো প্রার্থী না থাকায় এই বিশাল ভোটাভুটি যেদিকে ঝুঁকবে, জয়ের পাল্লা সেদিকেই ভারী হবে। তবে গণ-অভ্যুত্থানের রক্তের দাগ মুছে যাওয়ার আগেই ‘ফ্যাসিবাদী’ শক্তির দোসরদের ভোট পেতে এই তোড়জোড়কে নৈতিকতাবিরোধী হিসেবে দেখছেন বিশিষ্টজনেরা।
নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে প্রার্থীরা এখন ‘প্রতিশোধ নয়, সম্প্রীতি’র রাজনীতিকেই আওয়ামী ভোটারদের বশ করার প্রধান কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
নেতাদের কণ্ঠে ‘নমনীয়’ সুর: কৌশল না কি সহানুভূতি?
বিগত কয়েকদিনের নির্বাচনি প্রচারে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে আওয়ামী সমর্থকদের প্রতি বিশেষ সহমর্মিতা প্রকাশ পেয়েছে:
- মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: ঠাকুরগাঁওয়ে এক সভায় তিনি বলেন, “হাসিনা আপা কর্মীদের বিপদে ফেলে পালিয়ে গেছেন, আমরা সেই কর্মীদের পাশে আছি। যারা অন্যায় করেনি, তাদের কোনো শাস্তি হতে দেব না।”
- ডা. শফিকুর রহমান (আমির, জামায়াত): কুলাউড়ায় অমুসলিম ও আওয়ামী সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “প্রতিহিংসা শান্তি আনে না। জামায়াত সবসময়ই আপনাদের পাশে ছিল এবং থাকবে।”
- ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ: রাজনীতিতে সহনশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিয়ে আওয়ামী ভোটব্যাংকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
- হারুনুর রশীদ (বিএনপি): চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ করার অজুহাতে কাউকে হয়রানি করা হলে থানা ঘেরাও করা হবে।
ভোটব্যাংকের পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বিদেশে বা আত্মগোপনে থাকলেও দেশে তাদের একটি সুসংগঠিত ভোটার গোষ্ঠী রয়ে গেছে।
১. বিকল্পহীন ভোটার: আওয়ামী লীগের দলীয় কোনো প্রার্থী না থাকায় এবং তাদের মিত্র জাতীয় পার্টির জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ হওয়ায় এই ভোটাররা এখন বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে যেকোনো একটি পক্ষকে বেছে নিতে পারেন।
২. নিরাপত্তার গ্যারান্টি: যারা স্থানীয়ভাবে আওয়ামী রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন, তারা এখন আইনি হয়রানি থেকে বাঁচতে বড় দলগুলোর ছত্রছায়ায় যেতে চাইছেন। প্রার্থীরাও এই সুযোগে বড় অঙ্কের ভোটের নিশ্চয়তা নিচ্ছেন।
১০ দলীয় জোটের আহ্বান
নোয়াখালী-৬ আসনে এনসিপির প্রার্থী আবদুল হান্নান মাসউদ সরাসরি সাধারণ আওয়ামী কর্মীদের জোটে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পিরোজপুর-৩ আসনে বিএনপির রুহুল আমীন দুলাল জানিয়েছেন, ‘ভালো মানুষ’ যারা আওয়ামী লীগ করেছেন, তাদের সব দায়িত্ব তারা নেবেন।
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শামছুল আলম এই প্রবণতাকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “যাদের হাতে ছাত্র-জনতার রক্তের দাগ লেগে আছে, ভোটের জন্য তাদের কাছে টানা নৈতিকতাবিরোধী। যারা আজ ভোটের জন্য তাদের কাছে যাচ্ছে, সুযোগ পেলে ফ্যাসিস্টরা তাদেরও ছাড়বে না।”
নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির মধ্যেই পর্দার আড়ালে চলা এই ‘ভোট লেনদেন’ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে বড় ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
















