মোস্তাফিজ বিতর্ক থেকে বিশ্বকাপ বর্জন; বন্ধুহীন বিসিবি কি তবে পাকিস্তানের পথে?
মার্কিন রাষ্ট্রনায়ক বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের সেই বিখ্যাত উক্তি— ‘ক্রোধে যার শুরু, লজ্জায় তার শেষ’—বর্তমানে বাংলাদেশের ক্রিকেটের করুণ পরিস্থিতির সাথে হুবহু মিলে যায়। আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে রিলিজ দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের মতো এক চরম ও আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্তে রূপ নিয়েছে। যে সংকটের সমাধান ক্রিকেটীয় কূটনীতির মাধ্যমে সম্ভব ছিল, তাকে ‘গোলামির দিন শেষ’ শীর্ষক রাজনৈতিক স্লোগানে রূপ দিয়ে আজ বিশ্ব ক্রিকেটে একঘরে হওয়ার পথে বাংলাদেশ। আইসিসির ভোটাভুটিতে ১৬ সদস্যের মধ্যে ১৪ জনের বিপক্ষে যাওয়া এবং একমাত্র পাকিস্তানের সমর্থন পাওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য কোনো ‘বিজয়’ নয়, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক ও আর্থিক বিপর্যয়ের অশনিসংকেত।
বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ক্রিকেটে যে ক্ষত তৈরি হতে যাচ্ছে, তার রেশ কতদিন থাকবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সংকটের সূত্রপাত: উগ্রবাদ বনাম ক্রিকেট
এই ডামাডোলের শুরুটা হয়েছিল ভারতের উগ্রবাদী গোষ্ঠী ও আধ্যাত্মিক গুরুদের চাপের মুখে কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR) থেকে মোস্তাফিজকে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে। বিসিসিআই কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ না দেখালেও বাংলাদেশের ক্রিকেটকর্তারা একে সরাসরি ‘জাতীয় সম্মান’ ও ‘রাজনীতির’ সাথে গুলিয়ে ফেলেন। বিসিবির উচিত ছিল আইপিএল কর্তৃপক্ষ ও বিসিসিআইয়ের সাথে টেবিলে বসে সমাধান খোঁজা, কিন্তু তা না করে মাঠের ক্রিকেটকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আইসিসির কাঠামো ও ভারতের ‘জমিদারি’
বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের আধিপত্য কোনো গোপন গোপন সত্য নয়। আইসিসির মোট রাজস্বের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে ভারত থেকে, যার ৩৮ শতাংশ সরাসরি পায় বিসিসিআই।
- জয় শাহ ফ্যাক্টর: আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ নিজেই ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সন্তান। এমন বাস্তবতায় পদ্ধতিগত বিচক্ষণতা না দেখিয়ে সরাসরি সংঘাতে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য কতটা যৌক্তিক ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ তামিম ইকবালের মতো সিনিয়র ক্রিকেটাররা।
- রাজস্বের ঝুঁকি: বিশ্বকাপে না যাওয়ার ফলে বাংলাদেশ কেবল প্রাইজমানিই হারাবে না, বরং আইসিসি থেকে বার্ষিক প্রাপ্য ২৬.৯ মিলিয়ন ডলারের বরাদ্দও এখন চরম ঝুঁকির মুখে।
কূটনৈতিক একাকিত্ব ও পাকিস্তানের ছায়া
আইসিসির বোর্ড সভায় বাংলাদেশের প্রস্তাবের পক্ষে মাত্র একটি ভোট (পাকিস্তান) পড়া আমাদের ক্রিকেট কূটনীতির চরম ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে। একসময় অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা শ্রীলঙ্কাকে পাশে পেলেও আজ বাংলাদেশ পুরোপুরি বন্ধুহীন।
১. একঘরে হওয়ার শঙ্কা: পাকিস্তান যেমন দীর্ঘদিন নিরাপত্তা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, বাংলাদেশকেও কি একই পথে হাঁটতে হবে?
২. খেলোয়াড়দের মনোবল: বিসিবির এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্রিকেটাররা। যাদের রুটি-রুজি ও স্বপ্ন এই খেলাকে কেন্দ্র করে, তাদের মতামত বা ক্যারিয়ারের কথা কি একবারও ভেবেছেন নীতি-নির্ধারকরা?
উগ্রপন্থীদের ‘ডাবল’ জয়?
ভারতের উগ্রপন্থীরা চেয়েছিল মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে সরাতে, কিন্তু বিসিবির হঠকারী সিদ্ধান্তে তারা এখন পুরো বাংলাদেশ দলকেই বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে ছিটকে দেওয়ার ‘বোনাস’ সুযোগ পেয়ে গেল। অর্থাৎ, এক ঢিলে দুই পাখি মারার সুযোগটি বাংলাদেশ নিজেই করে দিল।
পরিশেষে, ক্রিকেটের লাভ-ক্ষতি, নিরাপত্তা এবং দেশের সম্মান—সবই জরুরি। কিন্তু আবেগের বশবর্তী হয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের খেসারত যদি পরবর্তী এক দশক ধরে দিতে হয়, তবে তার দায় কে নেবে? ক্রিকেটকে রাজনীতির হাতিয়ার না বানিয়ে মাঠের লড়াইয়ে ফেরার পথ খোঁজাটাই কি এখন সময়ের দাবি নয়?
















