সাবেক এমডি ও প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা; কালিয়াকৈরের সেন্ট্রাল ডাটা সেন্টার উপেক্ষা করে লুটপাটের ছক
সরকারের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এবং আইসিটি বিভাগের প্রজ্ঞাপনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজস্ব ডাটা সেন্টার নির্মাণের নামে রাষ্ট্রের অন্তত ৭৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ক্ষতিসাধন করেছে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো)। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, বিপুল অর্থ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে স্থাপিত ‘ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার’ ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আলাদা প্রকল্প নিয়ে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই দুর্নীতির অভিযোগে ডেসকোর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. কাউসার আমীর আলী এবং প্রধান প্রকৌশলী শামীম আহসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুদক। ক্ষমতার অপব্যবহার ও পরস্পর যোগসাজশে সরকারি তহবিল তছরুপের দায়ে গত ২২ জানুয়ারি ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এই মামলাটি রুজু করা হয়।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী আইসিটি বিভাগের অনুমতি ছাড়া কোনো সংস্থার নিজস্ব ডাটা সেন্টার নির্মাণের সুযোগ না থাকলেও ডেসকো প্রশাসন অত্যন্ত গোপনে এই লুটপাটের নীল নকশা বাস্তবায়ন করে।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্নীতির ছকটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত:
- সেপ্টেম্বর ২০২০: সরকার কালিয়াকৈরে ‘বাংলাদেশ ডাটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড (বিডিসিসিএল)’ চালু করে এবং সব সরকারি তথ্য সেখানে সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়।
- ডিসেম্বর ২০২০: মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে সিদ্ধান্ত হয়, কোনো সংস্থা আলাদা ডাটা সেন্টার নির্মাণ করতে পারবে না এবং বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত দিতে হবে।
- জানুয়ারি ২০২১: আইসিটি বিভাগ এই মর্মে কঠোর প্রজ্ঞাপন জারি করে।
- এপ্রিল ২০২১: সব সরকারি নির্দেশনা তোয়াক্কা না করে ডেসকো কর্তৃপক্ষ প্রায় ৭১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নিজস্ব ডাটা সেন্টার নির্মাণের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে।
দুদকের অভিযোগ ও আইনি ধারা
দুদক মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন জানান, আসামিরা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো হলো:
১. সরকার অমান্য: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও আইসিটি বিভাগের বারবার দেওয়া সতর্কবার্তা ও চিঠি উপেক্ষা করা।
২. আর্থিক ক্ষতি: সেন্ট্রাল ডাটা সেন্টার ব্যবহার করলে যেখানে খরচ ন্যূনতম হতো, সেখানে অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে রাষ্ট্রের ৭৪ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯২ টাকা নষ্ট করা।
৩. আইনি ধারা: আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ (বিশ্বাসভঙ্গ) ও ১০৯ (প্ররোচনা) ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা করা হয়েছে।
উচ্চপর্যায়ের অসন্তোষ ও তদন্ত
২০২২ সালে কালিয়াকৈরের জাতীয় ডাটা সেন্টারে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সভায় ডেসকোর এই অবাধ্যতার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে আসে। ওই সভার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পুনরায় সকল মন্ত্রণালয়কে কড়া চিঠি দেওয়া হলেও ডেসকো তাদের প্রকল্প থেকে পিছিয়ে আসেনি। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মূলত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া এবং কমিশনের টাকা হাতিয়ে নিতেই তৎকালীন এমডি ও প্রধান প্রকৌশলী এই আত্মঘাতী পথে হাঁটেন।
ডেসকোর বর্তমান কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে দুদক জানিয়েছে, এই লুটপাটের পেছনে আরও কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে অধিকতর তদন্ত শুরু হয়েছে।
















