আফগানিস্তানে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১০ জন শিশুর একজন তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি খাদ্যসংকট, বাস্তুচ্যুতি ও নানা দুর্যোগের কারণে দেশটির শিশুদের অপুষ্টি পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, চলতি বছরে আফগানিস্তানে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৩৭ লাখে পৌঁছেছে। গত চার বছরে এই সংখ্যা ১৪ শতাংশ বেড়েছে।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশটির দুই-তৃতীয়াংশ প্রদেশে শিশুদের তীব্র অপুষ্টির মাত্রা আরও বেড়েছে। অর্থাৎ পরিস্থিতির উন্নতি তো হয়নি, বরং অনেক এলাকায় সংকট আরও গভীর হয়েছে।
তীব্র অপুষ্টি বলতে অল্প সময়ের মধ্যে শিশুর ওজন ও পুষ্টিগত অবস্থার ভয়াবহ অবনতি বোঝায়। পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়া অথবা গুরুতর অসুস্থতার কারণে শরীর দ্রুত চর্বি ও পেশি হারালে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আফগানিস্তানে অপুষ্টি বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে মানবিক সহায়তা কমে যাওয়াকে দায়ী করা হয়েছে। অর্থের অভাবে প্রায় ছয় শ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। এসব স্বাস্থ্যসেবার ওপর আগে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ নির্ভরশীল ছিল, যাদের প্রায় অর্ধেকই শিশু।
গত চার বছরে আফগানিস্তানের জন্য মানবিক সহায়তার পরিমাণ প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। দুই হাজার বাইশ সালে যেখানে প্রায় ৩২৭ কোটি ডলার সহায়তা পাওয়া গিয়েছিল, দুই হাজার পঁচিশ সালে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ১০০ কোটি ডলারে।
চলতি বছরের অর্ধেকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মাত্র প্রায় ৪৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত হয়েছে। এতে প্রয়োজনীয় অর্থের প্রায় ৭৪ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার পাশাপাশি আফগানিস্তানের জনসংখ্যাও বেড়েছে। দুই হাজার তেইশ সালের সেপ্টেম্বরের পর দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনে পাকিস্তান ও ইরান থেকে ছয় মিলিয়নের বেশি আফগান নাগরিকের ফিরে আসার ঘটনাও বড় ভূমিকা রেখেছে।
ফিরে আসা এসব মানুষের অনেকে নতুন করে খাদ্য, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার সংকটে পড়েছেন। এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাম্প্রতিক সংঘাত এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে সীমিত মানবিক সম্পদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন। সেখানে একটি আন্তর্জাতিক শিশু সহায়তা সংস্থা বর্তমানে ১৪টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু রেখেছে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে।
আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দুই হাজার একুশ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দেশটি থেকে সেনা প্রত্যাহার করে। এরপর অনেক আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা সহায়তা কমিয়ে দেয়, অর্থায়নের ক্ষেত্রে নতুন শর্ত আরোপ করে এবং কিছু কর্মসূচি বন্ধ বা সীমিত করে।
নারী মানবিক সহায়তাকর্মীদের কাজের ওপর তালেবানের বিধিনিষেধও স্বাস্থ্য ও ত্রাণ কার্যক্রমে বড় বাধা তৈরি করেছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের কাছে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার আগে যুক্তরাষ্ট্র ছিল আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় সহায়তাদাতা দেশগুলোর একটি। উন্নয়ন, পুনর্গঠন ও মানবিক কার্যক্রমে দেশটি বড় অঙ্কের অর্থ দিত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তানে সরাসরি সহায়তা ব্যাপকভাবে কমে যায় এবং অধিকাংশ সহায়তা জাতিসংঘ ও বেসরকারি সংস্থার মতো পরোক্ষ ব্যবস্থার মাধ্যমে পৌঁছাতে থাকে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন বিদেশি সহায়তা কমিয়ে দেওয়ায় আফগানিস্তানের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। পাশাপাশি তালেবানের শীর্ষ নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আফগান রাষ্ট্রীয় সম্পদ জব্দ থাকার বিষয়টিও দেশটির অর্থনৈতিক সংকটকে জটিল করেছে।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিশ্বব্যাংকও বড় আকারের পুনর্গঠন সহায়তা বন্ধ করে দেয়। পরে বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে তুলনামূলক ছোট পরিসরে জরুরি মানবিক কর্মসূচি চালু করা হলেও তা বর্তমান প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
আফগানিস্তানে তীব্র ক্ষুধা, বিপুলসংখ্যক মানুষের দেশে ফিরে আসা, অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংঘাত এবং দীর্ঘ খরা—সব মিলিয়ে মানবিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট আরও গভীর হওয়ার আগে পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিশুরাই।
















