মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ২৫ জানুয়ারি তাদের বহুল আলোচিত ও সমালোচিত নির্বাচনের তৃতীয় এবং শেষ ধাপ এগিয়ে নিচ্ছে। এই ধাপের প্রার্থী তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে নতুন কিছু নেই; বরং বর্তমান জান্তা মন্ত্রী, দলীয় চেয়ারম্যান, সাবেক জেনারেলদের সন্তান এবং এমনকি এক সাবেক ইউটিউব ভ্লগারও রয়েছেন।
এই ধাপে নয়টি রাজ্য ও অঞ্চলের ৬৩টি টাউনশিপে ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কাচিন, কারেন, সাগাইং, তানিনথারি, বাগো, মান্দালয়, ইয়াঙ্গুন, শান ও আয়েয়ারওয়াদি অঞ্চল। এসব এলাকার অনেকগুলোতেই এখনো জান্তার বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চলছে।
প্রথম দুই ধাপের মতো তৃতীয় ধাপেও সামরিক বাহিনীর সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা ইউএসডিপি আধিপত্য বজায় রেখেছে। আগের ধাপগুলোতে দলটির চেয়ারম্যান খিন ই, উপচেয়ারম্যান মিয়াত হেইন ও মিয়ো জাও থেইন, জান্তা নিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী নিয়ো সো, একাধিক ইউনিয়ন মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী ও সামরিক কর্মকর্তারা প্রার্থী হয়ে সহজেই জয় পান।
শেষ ধাপেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্টের দপ্তরের মন্ত্রী তুন ওহন, শ্রমমন্ত্রী অং কিয়াও হো এবং জান্তার কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য ইয়ান কিয়াও এই ধাপে প্রার্থী হয়েছেন। ইয়ান কিয়াও শান রাজ্যের মেটম্যান এলাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন করছেন, ফলে তাঁর জয় প্রায় নিশ্চিত।
সামরিক পরিবারের উত্তরসূরিরাও এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণভাবে উপস্থিত। সাবেক জেনারেল টিন পের ছেলে নন্দা কিয়াও স্বার ইয়াঙ্গুনের ডাগন টাউনশিপে প্রার্থী হয়েছেন। তিনি ২০২০ সালের নির্বাচনে এনএলডির কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট দপ্তরের মন্ত্রী সো থানের ছেলে আয়ে চান হ্লাইং থারিয়ার (ইস্ট) এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর বাবা ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিলেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যানরাও এই ধাপে নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন। পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক ছাত্রনেতা কো কো জি, সামরিক ঘনিষ্ঠ মিয়ানমার ফারমার্স ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান কিয়াও স্বার সো এবং ফেডারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারওম্যান চো চো কিয়াও নিয়েইন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তবে আগের ধাপগুলোতে এসব দলের ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ায় তাঁদের প্রভাব নিয়ে সংশয় রয়েছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দিয়েছেন সাবেক ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী সান সিন্ট। দুর্নীতির দায়ে একসময় কারাবন্দি থাকা এই সাবেক জেনারেল আয়েয়ারওয়াদি অঞ্চলের ইয়েগি টাউনশিপে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। আরেক আলোচিত নাম নান সু থাজিন অং, যিনি ভিভি চেন নামে পরিচিত সাবেক যৌনশিক্ষা বিষয়ক ভ্লগার। তিনি হ্লাইং থারিয়ার (ওয়েস্ট) এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এই ধাপে অন্তত আটটি আসনে মাত্র একজন করে প্রার্থী থাকায় তাঁদের বিনা ভোটেই জয়ী ঘোষণা করা হবে। তিন ধাপ মিলিয়ে মোট ৩১ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৮ জনই ইউএসডিপির।
সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা না থাকায় এবং অন্যান্য দল নিরাপত্তার কারণে প্রচার চালাতে না পারায় ইউএসডিপি সহজেই প্রার্থী দিতে পেরেছে। আগাম ভোট ব্যবস্থার সমালোচনাও দলটির পক্ষে কাজ করেছে বলে পর্যবেক্ষকদের মত।
জান্তা এমন সব এলাকাতেও ভোট আয়োজনের চেষ্টা করছে, যেখানে তাদের পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেই। মান্দালয় ও বাগো অঞ্চলে ভোট নিশ্চিত করতে সামরিক অভিযান জোরদার করা হয়েছে। অন্যদিকে কাচিন ও কারেন রাজ্যে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়েছে।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে প্রথম ধাপ এবং জানুয়ারির মাঝামাঝি দ্বিতীয় ধাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, এই নির্বাচনে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনো সুযোগ নেই। জাতীয় লীগ ফর ডেমোক্রেসি নিষিদ্ধ, এর শীর্ষ নেতারা কারাগারে বা নির্বাসনে। ফলে সামরিক সমর্থিত ইউএসডিপির জয় প্রায় নিশ্চিত।
জান্তা সরকার মার্চে সংসদ বসানো এবং এপ্রিলে নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও তারা দাবি করছে, এই নির্বাচন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাচ্ছে, তবে পশ্চিমা দেশগুলো, জাতীয় ঐক্য সরকার, জাতিগত প্রতিরোধ সংগঠন ও গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলো একে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে মানতে নারাজ।
তাদের ভাষায়, এটি কোনো নির্বাচন নয়; বরং সামরিক শাসনকে পাকাপোক্ত করার জন্য সাজানো এক প্রহসন।
















