চীন এমন এক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দাবি করেছে যা স্টেলথ বিমানের গোপন উড়ান শনাক্তকরণে নতুন অধ্যায় খুলতে পারে। দেশটি জানিয়েছে, তারা বিশ্বের প্রথম চার-চ্যানেলযুক্ত অতিসংবেদনশীল একক-ফোটন শনাক্তকরণ যন্ত্র বা “ফোটন ক্যাচার” গণউৎপাদন শুরু করেছে। এই উদ্ভাবন কোয়ান্টাম যোগাযোগ ও স্টেলথ বিমান শনাক্তকরণে বিপ্লব আনতে পারে বলে দাবি করেছে সরকারি সংবাদমাধ্যম সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ডেইলি।
আনহুই প্রদেশের কোয়ান্টাম ইনফরমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজি রিসার্চ সেন্টার এই যন্ত্রটি তৈরি করেছে, যা একক ফোটন শনাক্ত করতে পারে—অর্থাৎ শক্তির ক্ষুদ্রতম কণা। এই প্রযুক্তি কোয়ান্টাম রাডারকে এমন সূক্ষ্ম কোয়ান্টাম পরিবর্তন ধরতে সক্ষম করে, যা প্রচলিত রাডার বুঝতে পারে না। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-২২ র্যাপটরের মতো স্টেলথ যুদ্ধবিমান শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
চীনের দাবি, এই যন্ত্রে শব্দমাত্রা বা নয়েজ ৯০ শতাংশ কমে গেছে এবং এটি মাইনাস ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কাজ করতে পারে। চারটি পৃথক চ্যানেল একসঙ্গে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে স্ক্যান করতে পারে, যা ইমেজিং দ্রুততর করে এবং শক্তি খরচও কমায়।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রযুক্তি এখনো মূলত পরীক্ষাগারভিত্তিক। কানাডার ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের গবেষক গ্রাহাম হিল জানিয়েছেন, তত্ত্ব অনুযায়ী কোয়ান্টাম রাডার স্টেলথ বিমানের মতো কম প্রতিফলনশীল লক্ষ্য শনাক্তে ৪০ শতাংশ বেশি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর ব্যবহার সীমিত কারণ এতে ক্রায়োজেনিক ঠাণ্ডা রাখার প্রয়োজন হয় এবং কার্যকর পরিসর ১০ কিলোমিটারের বেশি নয়।
মিচেল ইনস্টিটিউট ফর এরোস্পেস স্টাডিজের হিদার পেনির মতে, কোয়ান্টাম রাডার এখনো “প্রায়োগিক কৌতূহল” মাত্র, কারণ এতে সংকেত একত্রীকরণ ধীর, ফোটন ফেরতের হার কম, এবং পরিবেশগত শব্দ অনেক। একইভাবে র্যান্ড ইনস্টিটিউটের এডওয়ার্ড পার্কার বলেছেন, বর্তমান কোয়ান্টাম রাডার কেবল লক্ষ্যবস্তুর দূরত্ব নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু দিক বা গতি নয়।
যুক্তরাষ্ট্র এই সীমাবদ্ধতার কারণে বিকল্প পদ্ধতি নিচ্ছে। যেমন, এফ-২২ বিমানে ইনফ্রারেড সার্চ অ্যান্ড ট্র্যাক (IRST) প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে, যা গোপন বিমানের তাপ চিহ্ন শনাক্ত করতে পারে এমনকি ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মধ্যেও।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কোয়ান্টাম রাডার যদি বাস্তবায়ন হয়, তবে এটি এককভাবে নয় বরং বহুপারত সনাক্তকরণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কার্যকর হতে পারে। স্যাটেলাইটভিত্তিক অপটিক্যাল সেন্সরও এতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বি-২ বোমারু বিমান গুগল ম্যাপে ধরা পড়ে, যা দেখায় যে স্টেলথ প্রযুক্তি অদৃশ্য নয়।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ক্লেটন সোয়েপের মতে, চীনের ইয়াওগান-৪১ স্যাটেলাইটগুলো ২.৫ মিটার পর্যন্ত রেজোলিউশন দিতে পারে, যা গাড়ির আকারের বস্তুও শনাক্ত করতে সক্ষম। এসব স্যাটেলাইট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুক্ত হলে স্টেলথ বিমানের গতিপথ বিশ্লেষণ করা আরও সহজ হবে।
এছাড়া ভূমিভিত্তিক রাডারেও চীন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দাবি করছে। জনস হপকিনস অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স ল্যাবরেটরির জে. মাইকেল দাহম জানান, চীনের সুবি রিফে থাকা ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি (VHF) “কাউন্টার-স্টেলথ” রাডার ৩ডি ট্র্যাকিং সক্ষমতা রাখে এবং স্যাটেলাইট চিত্রেও এটি শনাক্ত করা গেছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, স্টেলথ ও কাউন্টার-স্টেলথ উভয়ই এখন একটি ইকোসিস্টেম বা সমন্বিত নেটওয়ার্কের অংশ। মিচেল ইনস্টিটিউটের ক্রিস ওয়েস্টউড বলেন, আসল প্রতিযোগিতা একক প্রযুক্তির নয়, বরং কোন পক্ষ সেন্সর, তথ্য বিশ্লেষণ ও দ্রুত সিদ্ধান্তগ্রহণকে ভালোভাবে একীভূত করতে পারে—সেই ক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে আধুনিক যুদ্ধে সাফল্য।
চীনের এই “ফোটন ক্যাচার” কোয়ান্টাম রাডার নিঃসন্দেহে দেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তবে বাস্তব লড়াই এখন প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ও নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণের, যেখানে জয়ী হবে সেই পক্ষ, যারা আগে দেখে, দ্রুত আঘাত হানে এবং দীর্ঘ সময় অদৃশ্য থাকতে পারে।
















