বেতনের ৬০ শতাংশই চলে যাচ্ছে ভাড়ায়; ১৯৯১ সালের আইন অকার্যকর হওয়ায় ‘জমিদারি প্রথা’র কবলে ভাড়াটেরা।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মাঝে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১-এর প্রয়োগ না থাকায় এবং ডিজিটাল তদারকির অভাবে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার এখন হুমকির মুখে।
দেশের আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন সবচেয়ে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে বাড়িভাড়া। টানা কয়েক মাস ধরে মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকেছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামে বাড়িওয়ালারা ১০ শতাংশের পরিবর্তে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধির নোটিশ দিচ্ছেন, যা অনেক পরিবারের জন্য বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মালিহা মেহনাজ এক নাগরিক সংবাদে এই সংকটের বিশদ চিত্র তুলে ধরেছেন। তার মতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম কয়েক দফা বাড়ার অজুহাতে বাড়িওয়ালারা ভাড়ার অঙ্ক কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
ভাড়ার পেছনেই বেতনের সিংহভাগ
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একজন চাকরিজীবীর মোট বেতনের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই চলে যাচ্ছে বাড়িভাড়ায়। অবশিষ্ট সামান্য অর্থ দিয়ে খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা মেটানো দুষ্কর হয়ে পড়ছে। এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে কয়েক মাসের ‘অ্যাডভান্স’ বা অগ্রিম গ্রহণের বোঝা, যা মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার তাদের সঞ্চয়টুকুও হারিয়ে ফেলছে।
আইনের অকার্যকারিতা ও প্রশাসনিক উদাসীনতা
বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১-এর অকার্যকারিতা নিয়ে উচ্চ আদালত থেকে বারবার নির্দেশনা এলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন নেই। এমনকি প্রতিটি থানায় ভাড়াটেদের তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে ভাড়ার পরিমাণ তদারক করার কোনো এখতিয়ার পুলিশের নেই। এর ফলে বাড়িওয়ালারা কোনো চুক্তিপত্র ছাড়াই ইচ্ছেমতো ভাড়া বৃদ্ধি ও মাঝবছরে ঘর খালি করার হুমকি দিয়ে এক প্রকার ‘জমিদারি প্রথা’ কায়েম করেছেন।
শহরের এই ‘নীরব যন্ত্রণা’ থেকে মুক্তি পেতে কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে:
- ব্যাংক লেনদেন বাধ্যতামূলক করা: ভাড়ার লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে করা হলে স্বচ্ছতা আসবে এবং সরকার বিপুল রাজস্ব পাবে।
- ইউনিক আইডি ও সিলিং: প্রতিটি বাড়ির জন্য ‘ইউনিক আইডি’ তৈরি করে ভাড়ার একটি সর্বোচ্চ সীমা বা সিলিং নির্ধারণ করে দেওয়া।
- সাশ্রয়ী আবাসন: রাজউক ও জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষকে কেবল উচ্চবিত্তের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ভাড়ার ফ্ল্যাট প্রকল্প হাতে নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আবাসন কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, এটি একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার। অবিলম্বে এই খাতের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল ও স্মার্ট ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা না হলে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিলুপ্তির পথে ধাবিত হবে।















