ভুল পথে বাংলাদেশের কূটনীতি?
রেমিট্যান্সে সাময়িক স্বস্তি থাকলেও সংকুচিত শ্রমবাজার, গুটিকয়েক দেশের ওপর নির্ভরতা ও দুর্নীতিগ্রস্ত অভিবাসন ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
দেশের অর্থনীতি বছরজুড়েই মন্দা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব বৃদ্ধি, রপ্তানিতে স্থবিরতা ও বিনিয়োগে নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধির মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক–এর তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী বছরে বৈধ পথে প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার—যা এক বছরে সর্বোচ্চ। এই অর্থ রিজার্ভে চাপ কিছুটা কমিয়েছে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
তবে এই স্বস্তি কতদিন টিকবে, তা নিয়ে গুরুতর সংশয় রয়েছে। কারণ রেমিট্যান্স বাড়লেও বাড়েনি জনশক্তি রপ্তানি। বরং বৈশ্বিক শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ায় এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গুটিকয়েক দেশের ওপর নির্ভরতা
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)–এর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গেছেন ১০ লাখ ১১ হাজার ৮৬৯ জন কর্মী। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ কর্মী গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে—সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। কিন্তু এই সংখ্যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। উদাহরণ হিসেবে সৌদি আরবের কথা উঠে আসছে বারবার। গত বছরে যাওয়া কর্মীদের প্রায় ৭০ শতাংশই গেছেন দেশটিতে। সৌদি আরবের নীতিতে সামান্য পরিবর্তন এলেই বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি বড় সংকটে পড়তে পারে।
বন্ধ শ্রমবাজার ও দক্ষতার ঘাটতি
মালয়েশিয়া, ওমান ও বাহরাইনের শ্রমবাজার বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ২০২৩ সালে ওমানে সোয়া লাখের বেশি কর্মী গেলেও ২০২৪ সালে গেছেন মাত্র ৩৫৮ জন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। বাহরাইনে ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগই বন্ধ।
দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো সম্ভাবনাময় বাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো যাচ্ছে না ভাষা ও দক্ষতার অভাবে। দক্ষিণ কোরিয়া ২০২৩ সালে ১০ হাজার কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দিলেও পাঠানো সম্ভব হয়েছে এর অর্ধেকেরও কম।
দুর্নীতির দুষ্টচক্র
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)–এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক তাসনিম সিদ্দিকী বলছেন, “সরকার দাবি করে ১৬৮টি দেশে কর্মী পাঠানো হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে ৯৫ শতাংশ কর্মীই যাচ্ছে ছয়টির কম দেশে।” তাঁর মতে, মালয়েশিয়ার বাজার বন্ধ হওয়ার পেছনে বাংলাদেশি ও মালয়েশীয় রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট বড় ভূমিকা রেখেছে।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দুর্নীতি ও অনিয়ম অভিবাসন ব্যয় বাড়িয়েছে। ভুয়া নিয়োগপত্র, অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং অদক্ষ কর্মী পাঠানোর প্রবণতা বাংলাদেশের শ্রমবাজার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিদেশে গিয়ে কাজ না পেয়ে অনেক কর্মী অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন—যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক জনশক্তি রপ্তানিতে।
নারী অভিবাসন ও কল্যাণ বরাদ্দ
নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালে নারী কর্মী যাওয়ার সংখ্যা নেমে আসে ৬০ হাজারের কিছু বেশি, যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। নিরাপদ ও দক্ষ নারী কর্মী পাঠাতে কার্যকর কৌশল এখনো দৃশ্যমান নয়।
এদিকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ কমে ৮৫৫ কোটি টাকায় নেমেছে, যা জাতীয় বাজেটের গড়ে মাত্র ০.০৮ শতাংশ। অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকীর মতে, এই বরাদ্দ কমে যাওয়া প্রমাণ করে যে প্রবাসী কল্যাণকে নীতিগত অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি।
কূটনীতির বড় পরীক্ষা
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, রেমিট্যান্সে সাময়িক স্বস্তি থাকলেও অভিবাসন কূটনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন না এলে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বাড়বে। শ্রমবাজার বহুমুখীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, রিক্রুটিং ব্যবস্থার সংস্কার এবং সক্রিয় শ্রম কূটনীতি ছাড়া বর্তমান সংকট কাটানো কঠিন। অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় এই ব্যর্থতা শুধু প্রবাসী আয় নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।















