মূল্যস্ফীতির চাপ কমাচ্ছে সবজি, কিন্তু চালই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ
আলু ও কিছু সবজির দাম কমে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে স্বস্তি এলেও চালের ক্রমবর্ধমান দাম সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে বলে সরকারি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
চালের দাম এখনো খাদ্য ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে রয়েছে। দাম ক্রমেই বাড়ছে, যা সাধারণ মানুষের ব্যয়ভার বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে এই চাপ কিছুটা হলেও প্রশমিত করছে আলু ও কয়েকটি সবজি। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)–এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে সবজির মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও চালের দামে উল্লম্ফন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খাদ্যপণ্যের মধ্যে শাকসবজি ও কন্দজাত ফসলের সম্মিলিত অবদান ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এ খাতে দাম কমেছে ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হয়েছে। এর মধ্যে আলু ও পেঁয়াজের অবদান যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
টিসিবির বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই শেষে আলুর দাম ছিল কেজিপ্রতি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। এক বছর পর তা নেমে এসেছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়, যা প্রায় ৫২ শতাংশ কম। চলতি সময়ে অনেক বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে ১৬ থেকে ২০ টাকায়। এতে ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পেলেও কৃষকেরা পড়েছেন লোকসানে।
অন্যদিকে চালের বাজারে চিত্র পুরোপুরি বিপরীত। টিসিবির তথ্য বলছে, গত এক বছরে সরু চালের দাম বেড়ে কেজিতে পৌঁছেছে প্রায় ৮৫ টাকায়। মাঝারি চাল, যা দেশের অধিকাংশ মানুষের প্রধান খাদ্য, ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ৭৫ টাকা। মোটা চালের দামও ৫৪–৬০ টাকায় উঠেছে। এই তিন ধরনের চালের দাম বেড়েছে যথাক্রমে প্রায় ১৬, ২১ ও ১১ শতাংশ।
জিইডির সর্বশেষ অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান মে মাসে ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ, যা জুলাই মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশে। এর মধ্যে মাঝারি ও মোটা চালের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। শুধু জুলাই মাসেই তিন ধরনের চালেই প্রায় ১৫ শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতি রেকর্ড হয়েছে।
গত তিন বছর ধরেই দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশের একটু বেশি। যদিও টানা কয়েক মাস মূল্যস্ফীতি কমছিল, জুলাই মাসে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ; খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সুদের হার বৃদ্ধি, চালসহ নিত্যপণ্যে শুল্ক ও কর কমানো এবং আমদানি সহজ করার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, আলুর দাম কমে মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও কৃষকেরা ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এতে আগামী মৌসুমে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চালের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে আমদানি, মজুত ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও কার্যকর হস্তক্ষেপ জরুরি। একই সঙ্গে কৃষকদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি—দুটিই বড় সংকটে পড়তে পারে।
















