ভারতের আকাশে যখন শুল্কের কালো মেঘ, তখনও আশ্চর্যভাবে আলো খুঁজে নিচ্ছে এক প্রাচীন সুপারফুড—ফক্স নাট, যাকে দেশজুড়ে সবাই চেনে মাখানা নামে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা উচ্চ শুল্কে ভারতীয় পণ্যের রপ্তানি যখন হোঁচট খাচ্ছে, তখন মাখানা যেন নিজের পথ নিজেই বানিয়ে নিচ্ছে—দেশের বাজারে আর নতুন নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে।
কলোরাডোর ডেনভারে থাকা রবজিৎ সিংয়ের সংসারে এই পরিবর্তনের আঁচ পড়েছে সরাসরি। কলকাতার এই প্রবাসী ব্যবসায়ী বলছেন, শুল্কের প্রভাবে বাজারের খরচ এমন বেড়েছে যে এক সময়ের দুই ডলারের ছোট প্যাকেট মাখানার দাম এখন চার ডলার। মাসিক বাজার খরচ যেখানে মহামারির আগে ছিল পাঁচশ ডলার, সেখানে এখন তা ছুঁয়েছে নয়শ ডলার। ডাল, বাসমতী চালের সঙ্গে প্রিয় নাশতা মাখানাও হয়ে উঠেছে বিলাস।
মাখানা মূলত জলশাপলার বীজ থেকে তৈরি, যার চাষ দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার জলাভূমি এলাকায়। প্রোটিন, ক্যালসিয়াম আর অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর এই খাবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর খাদ্য হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ৫০ শতাংশ শুল্ক ভারতীয় রপ্তানিতে বড় ধাক্কা দেয়, বিশেষ করে রাশিয়ার তেল আমদানিকে কেন্দ্র করে আরোপিত এই সিদ্ধান্তে। এর প্রভাব পড়ে চিংড়ি, হীরা, বস্ত্রের পাশাপাশি মাখানার রপ্তানিতেও। যুক্তরাষ্ট্রে মাখানার রপ্তানি প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
তবু এই সংকটের মাঝেও আশা হারাননি ব্যবসায়ীরা। ভারতের মোট মাখানা উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে বিহার রাজ্য থেকে। প্রায় দেড় লাখ কৃষক এই ফসলের সঙ্গে যুক্ত। বছরে প্রায় এক লাখ বিশ হাজার টন বীজ আর চল্লিশ হাজার টন প্রস্তুত মাখানা উৎপাদিত হয় এখানে। জলাভূমিতে সহজ চাষ, কম খরচ আর তুলনামূলক বেশি লাভ—সব মিলিয়ে মাখানা হয়ে উঠছে কৃষকের ভরসা।
রপ্তানিকারক সত্যজিৎ সিং বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এত দিন প্রধান বাজার হলেও এখন স্পেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যের মতো নতুন বাজারে আগ্রহ বাড়ছে। প্রবাসী ভারতীয়দের হাত ধরে মাখানা ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের খাদ্যতালিকায়। তাঁর মতে, এই খাত এখনো শুরুর পর্যায়ে, সামনে সুযোগ অনেক।
দেশের ভেতরেও মাখানার চাহিদা বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। করোনাকালের পর স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়তেই ঘরে ঘরে ফিরেছে এই পুরোনো খাবার। এখন সুপারশপের তাকজুড়ে নানা স্বাদের মাখানা—পেরি পেরি, টক টমেটো, চিজ, অনিয়ন অ্যান্ড ক্রিম। কলকাতার সফটওয়্যার প্রকৌশলী সুজয় ভার্মা বলছেন, প্রতিদিন সকালের নাশতায় তাঁর মেয়েদের সামনে থাকে মাখানার প্লেট। দাম কম, স্বাস্থ্য ভালো—এই দুয়ের মিলেই মাখানার জয়যাত্রা।
সরকারও বুঝেছে সম্ভাবনার কথা। এক বিলিয়ন রুপি বরাদ্দ দিয়ে গঠিত হয়েছে মাখানা বোর্ড, যার লক্ষ্য প্রশিক্ষণ, মাননিয়ন্ত্রণ আর রপ্তানি সহজ করা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি নিয়মিত মাখানা খান এবং ভারতীয় এই সুপারফুডকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার সময় এসেছে।
চাষের জমি বাড়ছে, শ্রমিকের আয় বাড়ছে। যেখানে এক দশক আগে প্রতি কেজি মাখানার দাম ছিল ৮১ রুপি, এখন তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪৫০ রুপি। দিনমজুরের দৈনিক আয় দ্বিগুণেরও বেশি। তাই অনেকেই অন্য ফসল ছেড়ে ঝুঁকছেন মাখানার দিকে।
শুল্কের কাঁটা পথ পেরিয়েও মাখানার এই যাত্রা যেন বলে দেয়, প্রাচীন খাবারের শক্ত শিকড় থাকলে বৈশ্বিক ঝড়েও টিকে থাকা যায়। বাজার বদলাবে, গন্তব্য বদলাবে, কিন্তু চাহিদার স্রোত থামবে না—এই বিশ্বাসেই এগোচ্ছে ভারতের মাখানা।
















