ডাটা সেন্টারের উচ্চগতির কম্পিউটার চিপগুলো ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে গিয়ে প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন করে। এই অতিরিক্ত তাপ সামাল দিতে এখন সেখানে ব্যবহার হচ্ছে নানা আধুনিক কুলিং প্রযুক্তি, যার মধ্যে রয়েছে তরল দিয়ে শাওয়ার দেওয়া কিংবা বিশেষ তরলে চিপ ডুবিয়ে রাখার পদ্ধতি।
লিকুইড কুলিং প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আইসোটোপের প্রধান নির্বাহী জোনাথন ব্যালন জানান, তাদের ব্যবস্থায় কিছু কম্পোনেন্টের ওপর তরল ছিটিয়ে দেওয়া হয় বা ওপর থেকে ধীরে ধীরে তরল নামানো হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে চিপগুলো তরল ভর্তি বিশেষ বাথের মধ্যে রাখা হয়, যা তাপ শুষে নিয়ে দ্রুত অপসারণ করে। এর ফলে চিপগুলো আরও বেশি গতিতে কাজ করতে পারে, যাকে বলা হয় ওভারক্লকিং।
তিনি জানান, এই পদ্ধতিতে সার্ভার নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি প্রায় নেই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের একটি হোটেল চেইন ডাটা সেন্টারের তাপ ব্যবহার করে অতিথিকক্ষ, লন্ড্রি ও সুইমিং পুল গরম করার পরিকল্পনাও করছে।
কুলিং ব্যবস্থা ছাড়া ডাটা সেন্টার কার্যত অচল হয়ে পড়ে। গত নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে একটি ডাটা সেন্টারের কুলিং সিস্টেম বিকল হয়ে বিশ্বের বৃহত্তম এক্সচেঞ্জ অপারেটর সিএমই গ্রুপের আর্থিক লেনদেন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে প্রতিষ্ঠানটি অতিরিক্ত কুলিং সক্ষমতা যুক্ত করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির প্রসারের কারণে ডাটা সেন্টারের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তবে বিপুল বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহারের কারণে এসব স্থাপনা পরিবেশগত দিক থেকে বিতর্কের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি দুই শতাধিক পরিবেশবাদী সংগঠন নতুন ডাটা সেন্টার নির্মাণে স্থগিতাদেশ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
তবে কিছু প্রতিষ্ঠান বলছে, তারা পরিবেশগত প্রভাব কমাতে কাজ করছে। একই সঙ্গে কম্পিউটার চিপের ক্ষমতা বাড়তে থাকায় প্রচলিত এয়ার কুলিং পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে আর যথেষ্ট নয়।
আইসোটোপের ব্যালন জানান, তাদের প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম এবং এতে কোনো ফ্যান ব্যবহার করা হয় না, ফলে এটি নিঃশব্দে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের লিকুইড কুলিং ব্যবস্থায় কুলিং সংক্রান্ত বিদ্যুৎ ব্যয় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
এই ব্যবস্থায় চিপের সংস্পর্শে থাকা তেলভিত্তিক তরল ঠান্ডা করতে পানি ব্যবহার করা হয়, তবে পানি একটি বন্ধ চক্রে থাকে, ফলে নতুন করে পানি নিতে হয় না। যদিও কিছু তরল জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি, তবে সেগুলোতে ক্ষতিকর পিএফএএস রাসায়নিক নেই বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
অন্যদিকে, কিছু কুলিং প্রযুক্তিতে এমন রেফ্রিজারেন্ট ব্যবহার হয় যাতে পিএফএএস থাকে এবং যা শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি করতে পারে। বাজার গবেষণা সংস্থার সাবেক বিশ্লেষক ইউলিন ওয়াং জানান, দুই ধাপের কুলিং সিস্টেমে ব্যবহৃত এসব রেফ্রিজারেন্ট তাপ পেয়ে তরল থেকে গ্যাসে রূপ নেয়, যা তাপ শোষণে কার্যকর হলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এর আগে বিভিন্ন ধরনের কুলিং পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। মাইক্রোসফট একসময় স্কটল্যান্ডের উপকূলে সমুদ্রের নিচে সার্ভার বসিয়ে ঠান্ডা পানির সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। পরে প্রকল্পটি বন্ধ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করে।
মাইক্রোসফট এখন চিপের ভেতরে ক্ষুদ্র তরল চ্যানেল দিয়ে কুলিংয়ের মতো নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি গবেষকেরাও বিদ্যুৎ বা পাম্প ছাড়াই তাপ ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তরল চলাচল করাতে সক্ষম প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বড় ভাষা মডেলসহ নতুন প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ায় ডাটা সেন্টারের শক্তি ও কুলিং প্রয়োজনও দ্রুত বাড়ছে। এসব মডেল প্রচুর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, ফলে কুলিং ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করতে হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় ডাটা সেন্টার প্রযুক্তিকে আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করতে নতুন কুলিং পদ্ধতির গুরুত্ব বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
















