ক্রিসমাসকে অনেক সময় পশ্চিমা সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এই ধর্মীয় আখ্যানের শিকড় মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ফিলিস্তিনে—এমনটাই মনে করছেন ফিলিস্তিনি খ্রিস্টান চিন্তাবিদ ও ধর্মযাজকেরা। তাঁদের মতে, যিশু খ্রিস্টের জন্মগাথা কোনো পশ্চিমা রূপকথা নয়; বরং তা দখল, অবিচার ও সাম্রাজ্যিক শাসনের মধ্যে সাধারণ মানুষের দুর্বলতা ও সংগ্রামের গল্প।
পশ্চিমা বিশ্বে প্রতি বছর ডিসেম্বর এলেই আলো, গান, কেনাকাটা আর উৎসবমুখর পরিবেশে ক্রিসমাস উদ্যাপন করা হয়। কিন্তু এই উদ্যাপনের আড়ালে যিশুর জন্মের বাস্তব প্রেক্ষাপট অনেকটাই আড়াল হয়ে যায়। যিশু জন্মেছিলেন সামরিক দখলের মধ্যে, এক সাম্রাজ্যিক শাসনের সময়, যেখানে তাঁর পরিবারকে জোরপূর্বক স্থানচ্যুত হতে হয়েছিল এবং পরে প্রাণ বাঁচাতে শরণার্থী হিসেবে পালাতে হয়—এই দিকটি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, যিশু ছিলেন এই অঞ্চলেরই একজন ইহুদি শিশু, যাঁর জন্ম আধুনিক রাষ্ট্রসীমার বহু আগে। খ্রিস্টধর্মের উৎপত্তি ইউরোপে নয়, বরং বর্তমান ফিলিস্তিন, সিরিয়া, লেবানন ও আশপাশের মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে। ফলে ‘পশ্চিমা খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ’ বা ‘জুডিও-খ্রিস্টীয় সভ্যতা’ শব্দবন্ধ বাস্তব ইতিহাসের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বর্তমান বেথলেহেমকে অনেক পশ্চিমা মানুষ কেবল বাইবেলের গল্পে সীমাবদ্ধ একটি কল্পিত স্থান হিসেবে দেখেন। বাস্তবে এই শহরটি দেয়াল, চেকপোস্ট ও চলাচলের বিধিনিষেধে ঘেরা একটি জীবন্ত জনপদ, যেখানে ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানরা দখলদারত্ব ও বৈষম্যের মধ্যে বসবাস করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাইবেলের বেথলেহেমকে পবিত্র হিসেবে স্মরণ করা হলেও আজকের বেথলেহেম ও এর মানুষের বাস্তব কষ্ট বিশ্বজুড়ে প্রায় উপেক্ষিত।
ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানদের দৃষ্টিতে, ক্রিসমাসের মূল বার্তা হলো ঈশ্বরের সংহতি—শক্তিশালীদের সঙ্গে নয়, বরং নিপীড়িত ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা। ঈশ্বর কোনো রাজপ্রাসাদে নয়, বরং এক সাধারণ গোয়ালঘরে জন্ম নেওয়া শিশুর মাধ্যমে উপস্থিত হন—এই বিশ্বাস তাদের কাছে দখল ও নিপীড়নের বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
দুই বছর বিরতির পর বেথলেহেমে আবার সীমিত পরিসরে ক্রিসমাস উদ্যাপন হচ্ছে। তবে এই উদ্যাপনকে স্থানীয়রা আনন্দের চেয়ে বেশি দেখছেন টিকে থাকার ঘোষণা হিসেবে। গাজায় চলমান সহিংসতা ও প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে পূর্ণ উৎসব আয়োজন করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন তারা।
ফিলিস্তিনি খ্রিস্টান নেতাদের মতে, ক্রিসমাস উদ্যাপন মানে বর্তমান বাস্তবতা অস্বীকার করা নয়। বরং এটি একটি বার্তা—বেথলেহেম এখনও আছে, ক্রিসমাসের জন্মভূমি এখনও জীবিত, আর এই ভূমির মানুষ এখনও ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও শান্তির প্রত্যাশায় অপেক্ষা করছে।
তাঁদের আহ্বান, বিশ্ববাসী যেন ক্রিসমাসকে কেবল উৎসব হিসেবে নয়, বরং তার প্রকৃত ঐতিহাসিক ও মানবিক প্রেক্ষাপটসহ স্মরণ করে। বেথলেহেমকে কল্পনায় নয়, বাস্তবতার আলোকে দেখলেই ক্রিসমাসের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।
















