মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব নতুনভাবে সাজাতে যুক্তরাষ্ট্র এক ব্যতিক্রমী কৌশল নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসন ইরাককে কেন্দ্র করে এমন এক নীতির পথে এগোচ্ছে, যার লক্ষ্য অর্থনৈতিক শক্তি ও সামরিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এই কৌশলের প্রতীকী নাম দেওয়া হয়েছে ‘মেক ইরাক গ্রেট এগেইন’।
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত মার্ক সাভায়ার ভাষ্য অনুযায়ী, এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো ইরাককে আবার একটি সার্বভৌম ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রে রূপান্তর করা, যেখানে বিদেশি প্রভাব ও সশস্ত্র মিলিশিয়াদের দাপট থাকবে না। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও সংঘাতের রাজনীতি থেকে সরে এসে ফলভিত্তিক ও লেনদেনকেন্দ্রিক কূটনীতির মাধ্যমে ইরাকের অর্থনীতি চাঙ্গা করাই এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু।
ওয়াশিংটনের পরিকল্পনায় ইরাকের জন্য দুটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। প্রথমত, সব সশস্ত্র বাহিনীকে রাষ্ট্রের বৈধ কমান্ডের অধীনে আনা। দ্বিতীয়ত, বিশেষ করে ইরানের মতো বিদেশি শক্তির প্রভাব কমানো। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য বাজার উন্মুক্ত করা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করাও এই কৌশলের অংশ।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পড়তে হচ্ছে জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখে। ইরাকের রাজনীতি এখনো নানা গোষ্ঠী ও সশস্ত্র শক্তির মধ্যে বিভক্ত। সংসদের বাইরেও প্রভাবশালী মিলিশিয়াগুলো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে কাজ করছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে এসব গোষ্ঠীর শক্ত অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আইনের শাসন কার্যকর করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ টানতে হলে এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব কমানো জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ স্বার্থ ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব স্থিতিশীলতার পথে বড় বাধা হয়ে আছে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসন প্রচলিত কূটনৈতিক ধারা এড়িয়ে গত অক্টোবর মাসে মার্ক সাভায়াকে বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেয়। ইরাকজন্মী, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এই ব্যবসায়ী কূটনীতিক নন, বরং বেসরকারি খাতে অভিজ্ঞ একজন উদ্যোক্তা। তাঁর দায়িত্ব মূলত নির্বাচনের পরবর্তী রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে ইরাককে একটি কার্যকর রূপান্তরের পথে আনা এবং অর্থনৈতিক বিনিয়োগের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর যোগসূত্র তৈরি করা।
ইরাক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের টানাপোড়েন এই কৌশলকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। একদিকে ওয়াশিংটন চায় ইরাককে ইরানের প্রভাববলয় থেকে বের করে আনতে, অন্যদিকে তেহরান ইরাককে নিজেদের আঞ্চলিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধরে রাখতে মরিয়া। বিশেষ করে শিয়া গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে ইরানের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
তবে আঞ্চলিক বাস্তবতায় ইরানের প্রভাব কিছুটা দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিতও মিলছে। সিরিয়ায় রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর অবস্থান দুর্বল হওয়ায় ইরাক এখন তেহরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ইরানে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
ইরাক ঘিরে এই সমীকরণে তুরস্ক ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তুরস্ক ইরাককে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে আগ্রহী, আর সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নতুন অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে সামনে আসছে। তবে এসব দেশের নিজস্ব স্বার্থও রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সব সময় মিলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতি আদর্শবাদ নয়, বরং বাস্তববাদী স্বার্থের প্রতিফলন। অর্থনৈতিক কূটনীতি ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে হাতিয়ার করে ইরাককে ইরানের প্রভাব থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এই পথে ইতিমধ্যে ইরাকের কয়েকটি ইরানঘনিষ্ঠ মিলিশিয়া অস্ত্র সমর্পণে সম্মতি দিয়েছে, যদিও সব গোষ্ঠী এতে রাজি হয়নি।
সব মিলিয়ে ইরাক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ দেশটির ভবিষ্যতের জন্য এক বড় পরীক্ষা। সফল হলে ইরাক হয়তো দীর্ঘদিন পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পথে হাঁটতে পারবে। ব্যর্থ হলে দেশটি আবারও ওয়াশিংটন ও তেহরানের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ময়দান হয়েই থেকে যাবে।
















