ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশজুড়ে যখন আগুনের লেলিহান শিখা, তখনই এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে সাবেক হন্ডুরাস প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে ক্ষমা করে মুক্তি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—যে মানুষটি অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রেই ৪৫ বছরের সাজা কাটাচ্ছিলেন। যেন যুদ্ধের ভাষা এক, কিন্তু লক্ষ্য ভিন্ন; ঘোষণা এক, কিন্তু উদ্দেশ্য ছায়ার মতো লুকিয়ে আছে অন্যত্র।
সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ক্যারিবীয় ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে অন্তত ২১টি ভেনিজুয়েলীয় নৌযানে মার্কিন হামলায় নিহত হয়েছে ৮০ জনের বেশি। ওয়াশিংটন দাবি করছে, এগুলো ছিল মাদকবাহী নৌকা—কিন্তু প্রমাণের পাতায় নেই সেই কথার ছাপ। বিশ্বের মাদকবাণিজ্যের জগৎ যখন জটিল ও অদৃশ্য সুতোর জালে বাঁধা, তখনই প্রশ্ন জাগে—এ কি সত্যিই মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দাবার ছক?
জাতিসংঘের তথ্য বলছে, বিশ্বের বেশিরভাগ কোকেন আসে কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়া থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিবেদনও জানায়, তাদের হাতে ধরা পড়া কোকেনের ৮৪ শতাংশই কলম্বিয়া থেকে আসে—ভেনিজুয়েলা নয়। ভেনিজুয়েলা কেবল এক ক্ষুদ্র পারাপার পথ, তার বেশি কিছু নয়।
তা হলে কেন ট্রাম্প হার্নান্দেজকে ক্ষমা করলেন? কেন তিনি এমন একজন নেতাকে মুক্তি দিলেন, যিনি প্রকাশ্যে মাদক আমদানির ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত? ট্রাম্পের দাবি, তাকে “অন্যায়ভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছে”। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, ভেনিজুয়েলাকে টার্গেট করার কারণ মাদক নয়—বরং দেশটির বামপন্থী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা। বরং যুক্তরাষ্ট্র নিজেই পুরস্কার ঘোষণা করে বেড়াচ্ছে মাদুরোর মাথার দাম—৫০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত।
কিন্তু সত্যিকারের গল্প আরও গভীর, আরও বিস্তৃত—ইতিহাসের প্রায় দুইশো বছরের ভাঁজে লুকিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মাদক-ব্যবহারের কাহিনি।
১৮০০ সালের আফিম যুদ্ধ থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ছায়া ঢাকা লাওস, আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে মুজাহিদিনকে সহায়তা, পাকিস্তানের সীমান্তে হেরোইনের স্রোত, নিকারাগুয়ার কুখ্যাত ইরান-কন্ট্রা চক্র, পানামার স্বৈরশাসক নোরিয়েগার সাথে গোপন আঁতাত—সবই যেন এক অন্ধ ইতিহাসের মিছিল। কখনও সিআইএ-র আড়ালে চলেছে অপিয়াম পরিবহন, কখনও সামরিক অভিযানের আড়ালে স্থানীয় চোরাকারবারিরা পেয়েছে খোলা দরজা।
হাইতির সামরিক শাসনামলেও আমেরিকার সহযোগী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠে কোকেন ট্রানজিটের অভিযোগ। যেন মাদক আর ভূ-রাজনীতি একে অন্যের হাত ধরে হাঁটছিল সেই অশান্ত সময়ে।
এমনকি মার্কিন সেনাদের নামও জড়িয়েছে মাদক পাচারের ঘৃণ্য অধ্যায়ে। দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন বাহিনীর সদস্যদের আটক, কলম্বিয়ায় মাদক বহনের অভিযোগে গ্রেপ্তার—এই তালিকা দীর্ঘ, আর নীরবতা আরও দীর্ঘতর।
মার্কিন ইতিহাসে মাদকবিরোধী যুদ্ধের ঘোষণাই যত জোরালো, তার ছায়ায় লুকিয়ে থাকা দ্বিমুখী নীতি ততবার ফিরে এসেছে প্রশ্ন হয়ে। যেন যুদ্ধের তলোয়ার একদিকে শত্রুর দিকে তোলা, আর অন্যদিকে বন্ধুর হাতে তুলে দেওয়া মাদক-পথের চাবি।
আজ ভেনিজুয়েলার নৌকায় আগুন জ্বলে, আর ওয়াশিংটন দাবি করে তারা মাদকবিরোধী যুদ্ধে নেমেছে। কিন্তু ইতিহাস নরম কণ্ঠে বলে—মাদক শুধু অপরাধ নয়, ছিল একসময় এক গভীর রাজনৈতিক হাতিয়ার, যা বহুচ্ছায়ার মতো ঘুরে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতির আকাশে ছায়া ফেলেছে।
এ যেন ইতিহাসের সেই পুরনো প্রশ্ন—যুদ্ধের আসল শত্রু কে? মাদক, নাকি ক্ষমতার লোভ?
















