আফ্রিকান ইউনিয়ন ২০২৫ সালকে ‘আফ্রিকা ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূতদের ন্যায়বিচারের বছর’ ঘোষণা করেছে। এ প্রেক্ষাপটে আফ্রিকান কোর্ট অব হিউম্যান অ্যান্ড পিপলস রাইটস জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবাধিকারের বিষয়ে পরামর্শমূলক মতামত দিতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ পেয়েছে—জলবায়ু সংকট ও ঔপনিবেশিকতার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির মধ্যে স্পষ্ট যোগসূত্র তুলে ধরার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) যে বিষয়টি উপেক্ষা করেছে, আফ্রিকান আদালত সেটি উচ্চারণ করলে জলবায়ু ন্যায়বিচারের পথে তা হবে বড় অগ্রগতি।
চলতি বছরের জুলাইয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনামলে মাদাগাস্কারের দক্ষিণাঞ্চলের আন্দ্রোই এলাকায় ৪০ হাজার হেক্টর খরা সহনীয় উদ্ভিদে ইচ্ছাকৃতভাবে মারাত্মক কীট ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। ১৯২৪ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত এই পরজীবী কীট বছরে প্রায় ১০০ কিলোমিটার বনভূমি ধ্বংস করে।
এই উদ্ভিদ স্থানীয় আন্তানদ্রোই জনগোষ্ঠীর খাদ্য, ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণ এবং খরা মোকাবিলার প্রধান অবলম্বন ছিল। ধ্বংসযজ্ঞের ফলে এক শতাব্দী পরও এসব মানুষ খরা এলেই দুর্ভিক্ষ, জায়গাছাড়া ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই খরা আরও ঘন ঘন হচ্ছে, আর এর জন্য দায়ী প্রধানত উচ্চ আয়ের দেশগুলো—যাদের মধ্যে রয়েছে মাদাগাস্কারের সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স।
জলবায়ু সংকট ও ঔপনিবেশিকতার সম্পর্ক নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বহুদিনের। ২০২২ সালে জলবায়ু বিষয়ক জাতিসংঘের আইপিসিসি স্পষ্ট করে জানায়, ঔপনিবেশিকতা শুধু জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত করেনি, বরং বহু জনগোষ্ঠীকে আজকের জলবায়ু দুর্বলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে বৈজ্ঞানিক তথ্যও কার্যকর হয় না। অধিক দূষণকারী দেশগুলো যখন দায় নিতে চায় না, তখন ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে ন্যায়বিচারের আবেদনই শেষ উপায় হয়। ২০২৩ সালে ভানুয়াতুর উদ্যোগে আইসিজেকে জলবায়ু নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর আইনগত বাধ্যবাধকতা নিয়ে মতামত দিতে বলা হয়। আফ্রিকার অনেক দেশ সেখানে ঔপনিবেশিক ক্ষতির প্রসঙ্গও তুলেছিল।
কিন্তু ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত সেই রায়ে ‘ঔপনিবেশিকতা’ শব্দটি একবারও আসেনি। আইসিজে এমনকি এ প্রশ্নও এড়িয়ে গেছে—ঐতিহাসিক ক্ষতির দায় কতদূর পেছনে গিয়ে নির্ধারণ করা যায়?
যদিও আদালত বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত দায় শুধু চুক্তিভিত্তিক নয়; প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের ভুল কাজ যদি মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করে, তবে তা অতীতের হলেও দায় বর্তায়।
এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আদালত আবার বলেছে, দোষ ও ক্ষতির মধ্যে ‘পর্যাপ্ত সরাসরি ও নিশ্চিত যোগসূত্র’ প্রমাণ করতে হবে—যা ঔপনিবেশিকতা ও জলবায়ু ক্ষতির ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব। ফলে ফ্রান্সের মতো দেশ সহজেই বলতে পারে, “ঘটনার এক শতাব্দী পেরিয়ে গেছে, এর সঙ্গে আজকের সংকটের নির্দিষ্ট সম্পর্ক প্রমাণ কীভাবে সম্ভব?”
বিশ্লেষকদের মতে, তাই প্রকৃত বাধা হলো রাজনৈতিক অনিচ্ছা—যারা ঔপনিবেশিকতার সুবিধাভোগী, তারা ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে চায় না।
এখন আফ্রিকান মানবাধিকার আদালত সেই নীরবতা ভেঙে বলতে পারে—জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ঔপনিবেশিকতার ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আদালত চাইলে আফ্রিকান ইউনিয়নের ২০২৫ সালের reparations ঘোষণার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ঐতিহাসিক অন্যায়ের ক্ষতিপূরণের পথে এগোতে উৎসাহিত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি শুধু আন্দ্রোই জনগোষ্ঠী নয়, গোটা আফ্রিকার জন্য ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের দরজা খুলে দিতে পারে—এবং বিশ্ব আদালতকেও বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সুযোগ দিতে পারে।















