চীন এখন বিশ্বব্যাপী ইলেকট্রিক গাড়ি উৎপাদনে শীর্ষস্থান দখল করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সড়কে সেসব গাড়ির উপস্থিতি খুবই কম। আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা ইভির আধিপত্য থাকলেও উত্তর আমেরিকায় তা প্রায় অনুপস্থিত—মূলত কঠোর শুল্কনীতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে।
ব্রাজিলের কামাসারি শহরে ফোর্ডের পুরোনো কারখানার জায়গায় চীনের ইভি নির্মাতা বিওয়াইডি’র নতুন বিশাল প্লান্ট উদ্বোধনের এক মাস পরই ব্রাজিলে শুরু হয় জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন। এ সম্মেলনের অন্যতম স্পনসর চীনা কোম্পানি বিওয়াইডি ও জিডব্লিউএম। চীন এখানে ৭৮৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতিকে আরো স্পষ্ট করেছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম অভিযোগ করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কার্যত “চীনের কাছে ভবিষ্যত তুলে দিয়েছেন” এবং জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রকে পিছিয়ে দিয়েছেন। ট্রাম্প বরাবরই জলবায়ু পরিবর্তনকে “প্রতারণা” বলে উল্লেখ করে এসেছেন।
চীনের ইভি একচ্ছত্র আধিপত্য
ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের গবেষক জোয়েল জ্যাগার জানান, মাত্র পাঁচ বছরে চীন হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গাড়ি রপ্তানিকারক। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলেকট্রিক গাড়ির ৭০ শতাংশই তৈরি করেছে চীন—প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ। এর মধ্যে ১২ লাখের বেশি রপ্তানি হয়েছে, বাকিগুলো দেশের ভেতরই বিক্রি হয়েছে।
চীনের সাফল্যের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি প্রণোদনা ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ বড় ভূমিকা রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় কেন কম দেখা যায় চীনা ইভি?
জ্যাগারের মতে, উত্তর আমেরিকার কঠোর শুল্কই বড় বাধা। গত বছর জো বাইডেন প্রশাসন চীনা ইভির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। এরপর কানাডাও একই পদক্ষেপ নেয়। ফলে ৩০ হাজার ডলার মূল্যের গাড়ির দাম যুক্তরাষ্ট্রে দাঁড়ায় ৬০ হাজার ডলার—যা বাজার প্রতিযোগিতাকে অসম্ভব করে তোলে।
কানাডার গবেষক আদিসু লাশিতেউ বলেন, দেশটির ২০৩৫ সালের মধ্যে পুরোপুরি ইভিতে রূপান্তরের লক্ষ্য থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে কানাডার পক্ষে আলাদা সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
তবে চীনা প্রযুক্তি উত্তর আমেরিকায় একেবারে অনুপস্থিত নয়। যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে বিপুল পরিমাণ লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি আমদানি করছে এবং সেগুলো ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় ইভি উৎপাদনে।
কোথায় বেশি জনপ্রিয় চীনা ইভি?
উন্নয়নশীল দেশে চীনা ইভির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু দেশে বিওয়াইডি, জিডব্লিউএমসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ড দ্রুত বাজার দখল করছে। ইউরোপেও শুল্ক থাকা সত্ত্বেও চীনা ইভির বিক্রি ভালো।
চীনে সরকার উৎসাহ দেওয়ায় স্থানীয় বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে—বিওয়াইডির নতুন ব্যাটারি মাত্র পাঁচ মিনিট চার্জ করেই ৪০০ কিমি যাত্রা সম্ভব বলে দাবি করা হচ্ছে, যা আগে চীনা ক্রেতাদের জন্যই উন্মুক্ত করা হয়েছে।
ইভির দাম এখন কেমন?
ইলেকট্রিক গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি খরচ কম হওয়ায় এখন মোট ব্যয় জীবদ্দশায় পেট্রল-ডিজেল গাড়ির তুলনায় কম। তবে ক্রয়মূল্য অনেক দেশে এখনো বেশি। চীনে প্রায় ৩০ হাজার ডলারের মধ্যেই ভালো মানের ইভি পাওয়া যায়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ মূল্যের মডেলই বাজারে বেশি।
শুধু গাড়ি নয়, দুই চাকার ইভিও
যুক্তরাষ্ট্র চীনা স্কুটার ও মোটরবাইক ব্যাপক হারে আমদানি করছে—গত বছর এই খাতের আমদানি বেড়েছে ২০ শতাংশের বেশি। সস্তা হওয়ায় দুই চাকার ইভি দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায়ও। ইউরোপের কিছু দেশে বাস বিক্রির ৪০ শতাংশ এখন ইলেকট্রিক।
সম্পূর্ণ চিত্রটি ইঙ্গিত করছে—বিশ্বের ট্রান্সপোর্ট সেক্টরে চীনের আধিপত্য দ্রুত বাড়লেও উত্তর আমেরিকা উচ্চ শুল্ক আর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এই পরিবর্তনের গতি থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
















