ভারতে ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (BCI) প্রযুক্তি দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। মস্তিষ্কের সংকেতকে ডিজিটাল কমান্ডে রূপান্তর করে কম্পিউটার, হুইলচেয়ার বা রোবোটিক অঙ্গ নিয়ন্ত্রণের এই প্রযুক্তি পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের যোগাযোগ ও চলাচলে সহায়তা এবং বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
বিশ্বে স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৩৪০ কোটির বেশি হওয়ায় নিউরোটেকনোলজির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি মস্তিষ্কের জটিল সংকেত বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। বৈশ্বিক BCI বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৬২০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চীন ইতোমধ্যে রোগীদের শরীরে Beinao No. 1 নামের BCI স্থাপন করেছে। অন্যদিকে Synchron-এর COMMAND পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা মস্তিষ্কের সংকেত ব্যবহার করে Apple Vision Pro নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এসব অগ্রগতি নিউরোটেকনোলজিকে গবেষণাগার থেকে বাস্তব চিকিৎসা ব্যবহারের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
ভারত অবশ্য তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল ও শরীরের বাইরে ব্যবহারযোগ্য BCI প্রযুক্তির ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশটির গবেষণার বড় অংশ সহায়ক যোগাযোগ, নিউরোরিহ্যাবিলিটেশন এবং কগনিটিভ উন্নয়নের জন্য পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি নিয়ে। IIT দিল্লির গবেষকেরা EEG ও fNIRS সমন্বিত হাইব্রিড ওয়্যারেবল BCI তৈরি করছেন, যা মস্তিষ্কের সংকেত শনাক্তের নির্ভুলতা বাড়াতে পারে।
ভারতে এ ধরনের প্রযুক্তির প্রয়োজনও বাড়ছে। ১৯৯০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দেশটির সামগ্রিক রোগের বোঝায় স্নায়বিক রোগের অবদান দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। স্ট্রোক বড় ধরনের স্নায়বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে এবং ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। ২০৩৬ সালের মধ্যে ভারতে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২৩ কোটির বেশি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে গবেষণা থেকে বাস্তব চিকিৎসা পণ্য তৈরিতে ভারতের বড় বাধা অর্থায়নের ঘাটতি, পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অবকাঠামোর অভাব এবং গবেষক, হাসপাতাল ও শিল্পখাতের মধ্যে দুর্বল সহযোগিতা। ফলে অনেক promising গবেষণা পরীক্ষামূলক পর্যায়েই থেকে যাচ্ছে এবং বাণিজ্যিকভাবে অনুমোদিত চিকিৎসা প্রযুক্তিতে রূপ নিতে পারছে না।
BCI প্রযুক্তি ব্যবহারে নৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের তথ্যের গোপনীয়তা, নিউরাল ডেটার মালিকানা, সাইবার নিরাপত্তা, রোগীর সম্মতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগী পর্যবেক্ষণের মতো বিষয় প্রচলিত চিকিৎসা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বাইরে বিশেষ নজর দাবি করছে।
ভারতের বিদ্যমান CDSCO, ICMR, Department of Health Research এবং Bureau of Indian Standards-এর মতো প্রতিষ্ঠান নিউরোটেকনোলজির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে প্রতিবেদনে এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি বিশেষায়িত নীতিমালা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
এ জন্য একটি National Neurotechnology Task Force গঠনের প্রস্তাবও সামনে এসেছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠান নিউরোসায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, সাইবার নিরাপত্তা, নীতিনির্ধারণ ও নৈতিকতার বিশেষজ্ঞদের একত্র করে প্রযুক্তিগত মান নির্ধারণ, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নৈতিক নির্দেশনা তৈরিতে সমন্বয় করতে পারে।
প্রতিবেদনটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিউরোটেকনোলজিতে ভারতের ভবিষ্যৎ সাফল্য শুধু গবেষণার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে না। গবেষণাকে চিকিৎসা পণ্য ও বাণিজ্যিক প্রযুক্তিতে রূপ দিতে অর্থায়ন, ক্লিনিক্যাল অবকাঠামো, শিল্প সহযোগিতা এবং দ্রুত কিন্তু দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
















