গত কয়েক দশক ধরে তাইওয়ানকে এমন মাত্রায় অস্ত্র সহায়তা দিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, যাতে সম্ভাব্য সামরিক আক্রমণের খরচ বাড়ে, কিন্তু দ্বীপটি কখনোই পুরোপুরি আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে। নতুন এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, এই নীতির মাধ্যমে একদিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের ওপর তাইওয়ানের দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীলতাও বজায় রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য প্রস্তাবিত অস্ত্র সহায়তাকে চীনের সঙ্গে আলোচনার একটি ‘দরকষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করলেও বাস্তবে এটি নতুন কোনো নীতি নয়। বরং অতীতের বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসন একই কৌশল অনুসরণ করলেও তা প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উনিশ শতকের শেষভাগের পর থেকে কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের আইনি কাঠামো অনুযায়ী তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার জন্য ‘পর্যাপ্ত’ সামরিক সক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হলেও সেখানে সর্বোচ্চ বা সমমানের অস্ত্র সরবরাহের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। ফলে বিভিন্ন সময়ে কোন ধরনের অস্ত্র, কত পরিমাণে এবং কখন সরবরাহ করা হবে, সে সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চার দশক ধরে উন্নত প্রযুক্তির বহু অস্ত্র সরবরাহ করা হয়নি অথবা দীর্ঘ বিলম্বে পুরোনো প্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। এতে তাইওয়ান সাময়িকভাবে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধরে রাখতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তিগত ব্যবধান ক্রমেই বেড়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগও নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির সর্বশেষ বিশেষ প্রতিরক্ষা বাজেটে দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন, যৌথ গবেষণা, যৌথ উৎপাদন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচি, নজরদারি সক্ষমতা এবং গোলাবারুদ উৎপাদন সম্প্রসারণের মতো একাধিক প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে তাইওয়ানের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী কার্যত একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র। ফলে অস্ত্র সরবরাহে বিলম্ব বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তন দেশটির প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হলেও বহু অস্ত্র এখনও সরবরাহ করা হয়নি, যা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে দ্রুত চলাচল সক্ষম, বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালনাযোগ্য এবং তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব দিতে উৎসাহিত করছে। তবে দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভর নীতির কারণে দেশীয় শিল্পভিত্তি এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি, যা এই কৌশল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন।
প্রতিবেদনটির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, তাইওয়ানের বর্তমান পরিস্থিতি কোনো একক সরকার, রাজনৈতিক দল বা সাম্প্রতিক কোনো কূটনৈতিক ঘটনার ফল নয়। বরং কয়েক দশকের ধারাবাহিক নীতির মাধ্যমে এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠেছে, যেখানে আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সক্ষমতা নিশ্চিত করা হলেও পূর্ণ কৌশলগত স্বাধীনতা অর্জনের সুযোগ সীমিত রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ‘পর্যাপ্ত’ সক্ষমতা ভবিষ্যতেও যথেষ্ট হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
















