কানাডার ইতিহাসে বিশের দশকে গড়ে ওঠা সাত শিল্পীর একটি চিত্রশিল্পী দল দেশটির শিল্প, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। শিল্পবিশেষজ্ঞদের মতে, এই শিল্পধারা শুধু কানাডার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে নতুনভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেনি, বরং দেশটির আধুনিক শিল্পচর্চার ভিত্তিও শক্তিশালী করেছে।
দেশটিতে প্রতি বছর সাতই জুলাই এই শিল্পী গোষ্ঠীকে স্মরণ করে বিশেষ দিবস পালন করা হয়। তাদের আঁকা পাহাড়, বনভূমি, হ্রদ, নদী ও বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক দৃশ্য আজও কানাডার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
শিল্প ইতিহাসবিদদের মতে, ওই সময় কানাডা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুললেও শিল্পকলায় ইউরোপীয় প্রভাবই ছিল প্রধান। সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে এই শিল্পীরা দেশটির নিজস্ব প্রকৃতি, আবহ ও অনুভূতিকে কেন্দ্র করে এক নতুন শিল্পরীতির সূচনা করেন। বাস্তব দৃশ্যের নিখুঁত অনুকরণের পরিবর্তে প্রকৃতিকে ঘিরে মানুষের অনুভূতি, আবেগ এবং প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ককে তারা চিত্রকর্মে তুলে ধরেন।
প্রথমদিকে তাদের কাজ ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়লেও বিদেশে প্রদর্শনীর পর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। এরপরই কানাডায় তাদের শিল্পকর্ম জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে সেগুলো জাতীয় শিল্প ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়।
তবে পরবর্তী সময়ে সমালোচকরাও প্রশ্ন তোলেন, এসব চিত্রকর্মে কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি কিংবা উপস্থিতি কেন অনুপস্থিত ছিল। তাদের মতে, সে সময় দেশের প্রচলিত জাতীয় পরিচয়ের ধারণায় আদিবাসীদের যথাযথ স্থান দেওয়া হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে সত্তরের দশকে আদিবাসী শিল্পীদের একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। তাদের লক্ষ্য ছিল আদিবাসী শিল্পীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিল্পচর্চার স্বীকৃতি বৃদ্ধি এবং প্রচলিত বৈষম্যমূলক ধারণার পরিবর্তন ঘটানো। তারা দাবি করেন, কানাডার ভূমি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রথম শিল্পধারা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেই এসেছে এবং সেই ঐতিহ্যকে জাতীয় শিল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
বর্তমানে কানাডার জাতীয় শিল্প জাদুঘরে আদিবাসী ও অনাদিবাসী—উভয় ধারার শিল্পকর্ম একই প্রদর্শনীতে স্থান পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর উদ্দেশ্য অতীতের ইতিহাস মুছে ফেলা নয়; বরং দেশের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমান গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা।
বিশ্লেষকদের মতে, শতবর্ষ আগে প্রকৃতিনির্ভর যে শিল্পধারা কানাডার জাতীয় পরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল, আজ তা নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়িত হচ্ছে। একই সঙ্গে আদিবাসী শিল্প ও ইতিহাসকে সমান মর্যাদা দেওয়ার মাধ্যমে দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে।
















