বাংলাদেশের ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে নতুন এক বাস্তবতার উদ্ভব হয়েছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি ও ভিডিও ভোটের পরিবেশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এই নির্বাচনকে অনেকেই দেশের প্রথম পূর্ণমাত্রার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর নির্বাচন হিসেবে দেখছেন।
নির্বাচনের আগে সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রনেতাকে এক ব্যক্তির সঙ্গে বসে থাকতে দেখা যায়, যাকে একটি হামলার সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করা হয়। পরে যাচাইয়ে জানা যায়, ছবিটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি।
নির্বাচনের সময়কালে বহু ভুয়া ছবি, ভিডিও ও তথাকথিত সংবাদ কার্ড ছড়িয়ে পড়ে, যা ভোটারদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল। একটি গবেষণায় দেখা যায়, নির্বাচনের আগে কয়েক মাসে অন্তত ৭২টি ঘটনায় কৃত্রিমভাবে তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্ট সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদের কর্মকাণ্ড বা বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুয়া হিসেবে তৈরি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের নাম ও লোগো ব্যবহার করে এমনভাবে তথ্য পরিবেশন করা হয়, যাতে তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরেও নানা কৃত্রিম ছবি ছড়ানো হয়, যেখানে তাকে এমন সব কাজ করতে দেখা যায় যা বাস্তবে ঘটেনি। একইভাবে তার মা খালেদা জিয়াকে নিয়েও ভুয়া ছবি ও তথ্য ছড়ানো হয়, যা তার শারীরিক অবস্থাকে ঘিরে বিভ্রান্তি তৈরি করে।
অন্যদিকে, নির্বাচন থেকে বাইরে থাকা আওয়ামী লীগকেও লক্ষ্য করে ভুয়া ভিডিও ও বক্তব্য প্রচার করা হয়। এমনকি বিদেশি নেতাদের নাম ব্যবহার করে সমর্থনের ভুয়া ভিডিও তৈরি করা হয়, যা পুরোপুরি কৃত্রিম ছিল।
সংবাদ কার্ড বা ফটোকার্ড বিকৃত করে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার নামে মিথ্যা বক্তব্য ছড়ানো একটি বড় কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একাধিক মাধ্যমে একই ভুয়া তথ্য ছড়ানো হলে তা আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
একটি সহিংস ঘটনার পর সেটিকে ঘিরেও কৃত্রিম ছবি ও তথ্য ছড়ানো হয়, যা মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিভ্রান্তি বাড়ায়। এমনকি গুজব ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যও কৃত্রিম ছবি ব্যবহার করা হয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলই এই ধরনের প্রচারণার লক্ষ্যবস্তু ছিল। সবচেয়ে বেশি আক্রমণের মুখে পড়ে বিজয়ী দল, পাশাপাশি অন্যান্য দলগুলোকেও লক্ষ্য করে বিভ্রান্তিমূলক কনটেন্ট ছড়ানো হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নির্বাচন দেখিয়ে দিয়েছে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কত বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই ধরনের প্রবণতা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও দেখা যেতে পারে।
তাদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তথ্য বিকৃতি রোধে শক্তিশালী নীতিমালা ও সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি, না হলে ভবিষ্যতে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য আরও অস্পষ্ট হয়ে পড়বে।
















