প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ এমন এক পরিস্থিতিতে আটকে আছে, যেখানে সবাই জানে বর্তমান অবস্থা দীর্ঘদিন টেকসই নয়, কিন্তু নেওয়া পদক্ষেপগুলো সমস্যার সমাধান না করে শুধু সময়ক্ষেপণ করছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে মূল সমাধান হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা না থাকায় অতীতের মতো বর্তমানেও রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে রাজি নয়। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের ব্যর্থ প্রত্যাবাসন উদ্যোগ সেই বাস্তবতাই স্পষ্ট করেছিল।
বর্তমানে সরকার প্রায়ই এই ব্যর্থতাকে পরিবহন, সময় বা চাপের বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও প্রকৃত সমস্যা রাজনৈতিক ও মানবিক। রোহিঙ্গাদের মধ্যে আশঙ্কা আরও বেড়েছে যে তারা ফিরে গেলে আগের চেয়েও খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা এখন অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন, গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংকটের কারণে বৈশ্বিক মনোযোগ সরে গেছে। ফলে অর্থায়নও কমছে, যা সংকটকে আরও জটিল করছে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সংকটের সমাধানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আশা তৈরি হলেও নির্বাচনকালীন আলোচনায় বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। দেশের ভেতরের অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য ও রাজনৈতিক বিষয়গুলোই ছিল মূল আলোচনায়।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করলেই চলবে না, প্রয়োজন কার্যকর কৌশল।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করলেও বাস্তব পরিবর্তন খুব কম এসেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। রাখাইন অঞ্চলে এখন একাধিক শক্তি সক্রিয়, ফলে প্রত্যাবাসনের পুরোনো কাঠামো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
এদিকে শরণার্থী শিবিরে নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটও বাড়ছে। হতাশা থেকে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাড়ি জমাচ্ছেন বা বিভিন্ন অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশকে এখন বহুমাত্রিক কৌশল নিতে হবে। শুধু প্রত্যাবাসনের ওপর নির্ভর না করে নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন নীতি প্রণয়ন জরুরি।
তাদের মতে, নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হলেও তা কার্যকর নীতির বিকল্প নয়। দীর্ঘদিন একই কৌশলে আটকে থাকলে সংকট আরও গভীর হবে।
সতর্ক করে বলা হচ্ছে, এখনই নতুন পরিকল্পনা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে। কারণ এই সংকটে নিষ্ক্রিয় থাকা মানে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া নয়, বরং ধীরে ধীরে একটি অকার্যকর সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
















