ইরানে আক্রমণ চালানো হলে তা আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বাড়ানোর প্রেক্ষাপটে রোববার তেহরানে এক সমাবেশে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন।
খামেনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার যুদ্ধ শুরু করে, তবে সেটি শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। তিনি অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ইরানের বিপুল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদ দখল করা।
১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের প্রেক্ষাপট তৈরিকারী আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নির্বাসন থেকে ইরানে প্রত্যাবর্তনের বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই সমাবেশে খামেনি সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নিয়েও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক অস্থিরতা ছিল অভ্যুত্থানের মতো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
খামেনির ভাষায়, এসব ঘটনায় পুলিশ, সরকারি দপ্তর, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর স্থাপনা, ব্যাংক ও মসজিদে হামলা চালানো হয়েছে এবং কোরআনের কপি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি এই বিক্ষোভকে আগের মতোই রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেন।
খামেনির বক্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি এখনো ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতার আশায় আছেন। তবে চুক্তি না হলে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা দেখা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে তেহরানের ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তা দ্রুতই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা অর্থনৈতিক দুরবস্থা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি ও পানির সংকট, পরিবেশ দূষণ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সীমিত হওয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, এই বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বা সহিংসতায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এক জাতিসংঘ বিশেষ প্রতিবেদক জানিয়েছেন, নিহতের সংখ্যা বিশ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকারকর্মীরা কয়েক হাজার মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহের কথা বলছেন।
ইরানি কর্তৃপক্ষ অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীরাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের হিসাবে, এসব ঘটনায় তিন হাজারের কিছু বেশি মানুষ মারা গেছে, যার মধ্যে বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক।
এদিকে পরিস্থিতি শান্ত করতে সরকার নাগরিকদের মোবাইলে বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছে, নারীদের মোটরসাইকেল চালানোর অনুমতি শিগগিরই দেওয়া হবে। বর্তমানে ইরানে নারীদের জন্য মোটরসাইকেল চালানো নিষিদ্ধ।
রোববার সংসদ ভবনে কট্টরপন্থি আইনপ্রণেতাদের আবারও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পোশাক পরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দিতে দেখা যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি এই বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার পর তেহরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইউরোপীয় সামরিক বাহিনীকে নিষিদ্ধ তালিকাভুক্ত করেছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে এবং গঠনমূলক সংলাপের পথ আরও কঠিন করে তুলবে।
বিপ্লবের বার্ষিকী উপলক্ষে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি ও সামরিক কুচকাওয়াজও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তেহরানের রাস্তায় সেনা, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
খামেনি তার বক্তব্যে দাবি করেন, জানুয়ারিতে সরকারপন্থী সমাবেশে লাখো মানুষ অংশ নিয়েছে, আর সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। তবে সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বিক্ষোভকারীদের নিয়ে বিদ্রূপ ও একপেশে প্রচার সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
















