ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া বা বারবার থেমে যাওয়া একটি গুরুতর রোগ, যার নাম স্লিপ অ্যাপনিয়া। এতে আক্রান্ত অনেকেই বিষয়টি বুঝতে পারেন না, অথচ এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাজ্যে ধারণা করা হচ্ছে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন, কিন্তু তাদের অল্প অংশেরই রোগ নির্ণয় হয়েছে।
স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হলে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস নেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। গুরুতর ক্ষেত্রে প্রতি মিনিটেই ১০ সেকেন্ডের বেশি সময় শ্বাস বন্ধ থাকতে পারে। অধিকাংশ মানুষ সকালে উঠে কিছুই টের পান না, কিন্তু সারাদিন অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করেন।
চিকিৎসা গবেষণা অনুযায়ী, চিকিৎসা না হলে এই রোগ আয়ু প্রায় এক দশক কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। স্থূলতার হার বাড়ার কারণে এখন কম বয়সীদের মধ্যেও এই রোগের প্রবণতা বাড়ছে।
লন্ডনের একটি হাসপাতালে কর্মরত শ্বাসরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান, এই রোগ নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তার পরামর্শে একজন স্বাস্থ্য প্রতিবেদক ঘুম পরীক্ষা বা স্লিপ স্টাডিতে অংশ নেন। এই পরীক্ষায় নাকে বিশেষ নল, বুকে ও পেটে বেল্ট এবং আঙুলে ক্লিপ লাগিয়ে সারা রাত শ্বাসপ্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন ও অক্সিজেনের মাত্রা রেকর্ড করা হয়।
এই ধরনের পরীক্ষার জন্য অনেক রোগীকে মাসের পর মাস, এমনকি এক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তাই অপেক্ষার সময় কমাতে অনেককে বাড়িতে পরীক্ষার সরঞ্জাম দেওয়া হয়, যার প্রতিটির দাম হাজার হাজার পাউন্ড।
সাধারণভাবে মনে করা হয়, স্লিপ অ্যাপনিয়া শুধু বয়স্ক ও অতিরিক্ত ওজনের পুরুষদের হয়। বাস্তবে এটি যেকোনো বয়স, লিঙ্গ ও শারীরিক গঠনের মানুষের হতে পারে। এমনকি চল্লিশের কোঠার সুস্থ, চিকন নারীরাও ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।
পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের ক্ষেত্রে এক ঘণ্টায় ১০ বার শ্বাস বন্ধ হয়েছিল, প্রতিবার প্রায় ৩০ সেকেন্ড করে। এ সময় অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। যদিও শরীর নিজে থেকেই তাকে জাগিয়ে আবার শ্বাস নিতে বাধ্য করেছে, তবু তিনি এর কিছুই টের পাননি।
চিকিৎসকের ব্যাখ্যায় জানা যায়, তার ক্ষেত্রে এটি হালকা মাত্রার অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া, যা মূলত চিত হয়ে ঘুমালে হয়। শ্বাসনালি কিছুটা সরু হওয়া ও ঘুমের সময় পেশি বেশি শিথিল হয়ে পড়াই এর কারণ।
এই রোগের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে রাতে জোরে নাক ডাকা, হঠাৎ শ্বাস নিতে হাঁপিয়ে ওঠা, ঘন ঘন ঘুম ভাঙা। দিনে মাথাব্যথা, মনোযোগে সমস্যা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব দেখা দেয়।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত পদ্ধতি হলো সিপ্যাপ যন্ত্র, যা মুখে মাস্ক লাগিয়ে বাতাস ঢুকিয়ে শ্বাসনালি খোলা রাখে। তবে অনেকেই এটি দীর্ঘদিন ব্যবহার করতে পারেন না, কারণ অস্বস্তি, দমবন্ধ ভাব বা খরচের সমস্যা থাকে।
একজন তরুণী জানান, তিনি গুরুতর স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন এবং ঘুমের মধ্যে প্রতি দুই মিনিটে একবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যেত। সিপ্যাপ ব্যবহারের পর তার জীবন বদলে যায়। তিনি ওজন কমাতে পেরেছেন, কর্মক্ষমতা বেড়েছে এবং পরবর্তী পরীক্ষায় দেখা গেছে, তার শ্বাস বন্ধ হওয়ার হার স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে এসেছে।
তবে হালকা ও মাঝারি মাত্রার রোগীদের জন্য বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে মুখে পরার বিশেষ একটি যন্ত্র ব্যবহারের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এটি নিচের চোয়াল সামান্য সামনে এনে শ্বাসনালি খোলা রাখতে সাহায্য করে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, এই যন্ত্র সিপ্যাপের তুলনায় বেশি সহনীয় হতে পারে। কিন্তু এটি এখনো সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় সহজলভ্য নয় এবং প্রশিক্ষিত দন্তচিকিৎসকের মাধ্যমে তুলনামূলক ব্যয়বহুলভাবে করাতে হয়।
কয়েক সপ্তাহ ব্যবহারের পর প্রতিবেদক জানান, তার শক্তি কিছুটা বেড়েছে, দিনের বেলা ঘুমের ভাব কমেছে এবং নাক ডাকার সমস্যাও হ্রাস পেয়েছে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, কেউ যদি মনে করেন তিনি স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ভুগছেন, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। হালকা উপসর্গ হলে ওজন কমানো, নিয়মিত ব্যায়াম, পাশ ফিরে ঘুমানো, ঘুমের আগে অ্যালকোহল কমানো ও ধূমপান বন্ধ করার মতো জীবনযাত্রার পরিবর্তন উপকার দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে স্লিপ স্টাডি করে যথাযথ চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
















