রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রায় চার বছর পর আবারও ভারত সফরে আসছেন—ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চাপের মাঝেই, সম্পর্কের বহুস্তরীয় ঝড় পেরিয়ে এই সফর হতে চলেছে একটি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক মুহূর্ত।
পুতিনের প্রায় ৩০ ঘণ্টার দ্রুত সফর এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক উত্তপ্ত, আর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কভার ভারতকে নতুন করে চাপে ফেলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে রুশ তেল কেনার ফলে পশ্চিমা অসন্তোষ আরও বেড়েছে, যার মাঝেই রুশ প্রেসিডেন্টের এই সফর দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধনকে আবার আলোচনায় তুলে ধরেছে।
স্বাধীনতার পর থেকে ভারত সবসময়ই পরাশক্তিদের সরাসরি জোট রাজনীতি এড়িয়ে চলে—শীতল যুদ্ধের সময় নাম লেখায় অ-জোট আন্দোলনে, যদিও বাস্তবে সে সময় মস্কোর সান্নিধ্যই যেন ছিল ঘনিষ্ঠ। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ালেও, রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখেছে ভারত।
কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ সেই ভারসাম্যকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে। পুতিনের এই সফর তাই দেখাবে—মোদির ভারত কতটা সূক্ষ্মভাবে এ দুই মিত্রের মাঝে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারে।
পুতিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে অবতরণ করবেন। রাতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনে নৈশভোজে অংশ নেবেন। পরদিন রাষ্ট্রপতি ভবনে গার্ড অব অনার, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে বৈঠক এবং মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধ রাজঘাটে শ্রদ্ধা নিবেদন—যেন কূটনৈতিক আচারনীতির ধাপে ধাপে এগোনো।
এরপর হায়দরাবাদ হাউসে হবে ভারত–রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ বৈঠক। দুই দেশের শিল্প ও বাণিজ্য নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর রাষ্ট্রপতির দেওয়া ভোজসভায় যোগ দেবেন পুতিন।
ক্রেমলিন আগে জানিয়েছিল, এই সফর “বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিস্তৃত আলোচনার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ”। পুতিনের সঙ্গে আসছেন রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলউসোভ ও রসোবোরোনএক্সপোর্ট থেকে শুরু করে রসনেফট ও গ্যাজপ্রম নেফট—নিষিদ্ধ তেল কোম্পানির প্রধানরাও।
২০১৯ সালের পর প্রথমবার এমন পরিসরে দিল্লিতে রুশ আগমন, তাও এমন এক সময়ে যখন মার্কিন–ভারত সম্পর্ক রাশিয়া নিয়ে সবচেয়ে টানটান।
বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা আলোচনায় থাকবে মিসাইল সিস্টেম, যুদ্ধবিমান, ফার্মাসিউটিক্যালসহ নানা খাত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুতিন চাইবেন রাশিয়ার আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার চিত্রটিকে বদলে দিতে—দেখাতে যে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র এখনও তাকে স্বাগত জানায়।
পরিস্থিতির আরেক ছায়া—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রুশ তেল কেনার জের ধরে ভারতীয় পণ্যে তার ধারাবাহিক শুল্কবৃদ্ধি, পরে রসনেফট ও লুকোইলে নিষেধাজ্ঞা—ভারতের তেল-ব্যবসাকে ধাক্কা দিয়েছে। ভারতীয় রিফাইনার রিলায়েন্স ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে, রুশ তেল ব্যবহার করে আর পণ্য রপ্তানি করবে না।
তবে প্রতিরক্ষায় ভারত–রাশিয়া সম্পর্ক আরও স্থির। ভারতের হাতে থাকা অস্ত্রের ৬০ শতাংশই রুশ তৈরি। সম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে চার দিনের আকাশযুদ্ধে ভারতের ভরসা হয়েছিল রুশ S-400 ব্যবস্থার ওপর—যাকে এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিং বলেছেন “গেম চেঞ্জার”। ভারত চাইছে আরও S-400 সিস্টেম, আর রাশিয়া চাইছে ভারতকে সু-৫৭ স্টেলথ ফাইটার বিক্রি করতে।
বাণিজ্যও নতুন মোড়ে। ২০২২ সালে ১০ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবার ছুঁয়েছে ৬৯ বিলিয়ন—রুশ তেলের জোরে। তবে রপ্তানির ভারসাম্যহীনতা রয়েছে—ভারতের রপ্তানি মাত্র ৫ বিলিয়ন, ফলে ৬৪ বিলিয়ন ডলারের বিশাল ঘাটতি। এই প্রেক্ষাপটে দুই দেশ শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা দেখছে—রাশিয়ায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৩.১ মিলিয়ন শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দেবে, যা ভারতীয় শ্রমিকরা পূরণ করতে পারে।
তবু ভারসাম্য রক্ষার বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে—একদিকে রাশিয়া ও ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার মধ্যে ভারতে বাড়ছে দ্বিধা।
এই দীর্ঘ টানাপোড়েনের মাঝেই পুতিনের দিল্লি সফর—একটি বৈঠক যা হয়তো আবারও প্রমাণ করবে, বৈশ্বিক রাজনীতির দাবা ছকে ভারতের ঘুঁটিগুলো কতটা নমনীয়, আর কতটা দৃঢ়। একমাত্র শান্তি—ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি—হয়তো এই জটিলতা খানিক হালকা করতে পারে।
















