আন্তর্জাতিক বাজারে কমদামে কয়লা মিললেও বড়পুকুরিয়া খনি কর্তৃপক্ষের দাবি টনপ্রতি ১৭৬ ডলার—মূল্য নিয়ে দুই পক্ষের টানাপোড়েন এক বছরে আরও জটিল।
Banglaপিডিবি ও বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষের মধ্যে কয়লার দাম নির্ধারণ নিয়ে বছরের পর বছর টানাপোড়েন চলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কমদামে কয়লা পাওয়া যাওয়ায় উচ্চমূল্য দিতে রাজি নয় পিডিবি। এদিকে বিসিএমসিএল এর দাবি করা দামেই গত চার বছরে বিরাট মুনাফা করেছে। Meta Description
দেশের একমাত্র সক্রিয় কয়লা খনি—দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া—এখন রাষ্ট্রায়ত্ত দুই প্রতিষ্ঠানের টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দু। কয়লার দাম নির্ধারণ ইস্যুতে পিডিবি ও বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ (বিসিএমসিএল) প্রায় এক বছর ধরে বিরোধে জড়িয়ে আছে। এই মূল্য সংকটের ফলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে অতিরিক্ত ৩ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তি ব্যয় বহন করতে হয়েছে, আর বিপরীতে বিসিএমসিএল রেকর্ড মুনাফা করেছে—যার অংশ হিসেবে ১৮১ কর্মী-কর্মকর্তা গত চার বছরে মাথাপিছু ৫৭ লাখ টাকা করে লভ্যাংশ পেয়েছেন।
উচ্চমূল্যের দাবি বনাম আন্তর্জাতিক বাজারদর
বড়পুকুরিয়া কর্তৃপক্ষ টনপ্রতি ১৭৬ ডলার করে দাম দাবি করছে, যা ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদন দেওয়া হলেও কোনো স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই কার্যকর করা হয়েছিল। তাদের দাবিকৃত দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সর্বোচ্চ মানের কয়লার চাইতেও অনেক বেশি।
বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া থেকে উচ্চমানের কয়লা আমদানি করা যাচ্ছে টনপ্রতি ১২৭ ডলারের কমে, আর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পরিবহন খরচ বাদ দিয়ে ৭২–৯৩ ডলারে কয়লা কিনছে। ফলে বিসিএমসিএলের ১৭৬ ডলারের দাবি পিডিবির জন্য ‘অযৌক্তিক চাপ’—এমন যুক্তি দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানান,
“আমরা তাদের বেঁধে দেওয়া দাম দিচ্ছি না। ওই দামে তাদের লাভ হলেও আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ।”
এখন পিডিবি প্রতি টনে আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী ৯৪–১০৬ ডলার পরিশোধ করছে, যা আগের দামের তুলনায় প্রায় ৭৭ শতাংশ কম।
কয়লা তুলতে ব্যয় ৮৫ ডলার, দাবি ১৭৬ ডলার
পিডিবির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলনে প্রকৃত ব্যয় টনপ্রতি প্রায় ৮৫ ডলার। অপরদিকে বিসিএমসিএল বলছে, তাদের উৎপাদন ব্যয় ১৩৮ ডলার এবং ভূমি অধিগ্রহণ ও ভবিষ্যৎ অনুসন্ধান খাতে অতিরিক্ত ৫০ ডলার যোগ করায় দাম এত বেশি ধরা হয়েছে।
কিন্তু তদন্তে জানা গেছে—ভূমি অধিগ্রহণের জন্য বরাদ্দ ১১০ কোটি টাকা এখনও বিনিয়োগই করা হয়নি; তা কোম্পানির মুনাফা হিসেবেই দেখানো হয়েছে।
মুনাফায় উজ্জ্বল বিসিএমসিএল, সংকটে পিডিবি
পিডিবি যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাড়তি ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বড়পুকুরিয়া খনি কর্তৃপক্ষ ধারাবাহিকভাবে মুনাফা বাড়িয়েছে। প্রতিবছর কর্মীদের মুনাফার ৫% প্রদান করা হয়, ফলে উচ্চমূল্যের সরাসরি সুবিধা পাচ্ছেন কর্মীরা।
দর নির্ধারণে নতুন কমিটি, আগের কমিটির ব্যর্থতা
মূল্য নির্ধারণে অচলাবস্থা কাটাতে জ্বালানি বিভাগ নতুন নয় সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। তারা স্থানীয় কয়লা বনাম আমদানি করা কয়লার ব্যবহার খরচ তুলনা করবে, বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবে এবং বকেয়া টাকার নিষ্পত্তিও দেখবে। আগের কমিটি এ সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
এজিএম স্থগিত, অনিশ্চয়তা অব্যাহত
মূল্য নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত বিসিএমসিএলের ৩১ ডিসেম্বরের বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) স্থগিত রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের এমডি আবু তালেব ফারাজি বলেছেন—নতুন দাম নির্ধারণ হলেই সভার নতুন তারিখ ঘোষণা করা হবে।
কয়লা খনির ওপর নির্ভরতা, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঝুঁকি
বড়পুকুরিয়ার কয়লা দিয়ে পিডিবির ৫২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র চালানো হয়। দাম বেশি হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদন ব্যয়ে এবং সামগ্রিক বিদ্যুৎ খাতে। ফলে এই মূল্যসমস্যা শুধু দুই প্রতিষ্ঠানের দ্বন্দ্ব নয়—দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি করছে।
এদিকে এ সংকট চলতে থাকলে আমদানি কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
















