মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আবারও তীব্র আলোচনার কেন্দ্রে—এই মানুষটি যিনি একসময় যুদ্ধক্ষেত্রের ধুলো মেখে ফিরেছিলেন, এখন ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ঝড়ে দাঁড়িয়ে আছেন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে। সিগন্যাল অ্যাপের সেই গোপন চ্যাট, যেখানে ভুলবশত যোগ হয়ে গিয়েছিল এক সাংবাদিক—মার্চের সেই ঘটনার রেশ এখনও ঝড় তোলে আমেরিকার ক্ষমতার করিডোরে।
কংগ্রেসে জমা দেওয়া পেন্টাগন ইন্সপেক্টর জেনারেলের এক শ্রেণিবদ্ধ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—হেগসেথ তার ব্যক্তিগত ফোন থেকে সিগন্যাল অ্যাপ ব্যবহার করে ইয়েমেনে হামলার মতো সংবেদনশীল সামরিক তথ্য আদান–প্রদান করে বিপদের মুখে ফেলেছিলেন মার্কিন বাহিনীর সদস্যদের। এই কাজ শুধু প্রোটোকল ভঙ্গই নয়, নিরাপত্তার জন্যও ছিল গুরুতর ঝুঁকিপূর্ণ।
তবু রিপোর্ট প্রকাশের আগেই হেগসেথ দাবি করেছেন—এটি তার “সম্পূর্ণ মুক্তি”। যেন এক ঝড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, কিছুই হয়নি। অথচ তদন্তে স্পষ্ট—তিনি অনুমোদনহীন ব্যক্তিদের পাঠিয়েছেন তথ্য; এমনকি অন্য একটি গ্রুপ চ্যাটে যোগ করেছিলেন তার স্ত্রী, ভাই ও ব্যক্তিগত আইনজীবীকেও।
হেগসেথের ঘনিষ্ঠদের দাবি—তিনি তথ্যগুলো আগে থেকেই ডি–ক্লাসিফাই করেছিলেন। কিন্তু এ দাবির কোনও নথি তদন্তকারীদের দেওয়া হয়নি। সত্য আর অর্ধসত্যের মাঝে দুলছে ওয়াশিংটন।
তদন্তে জানা যায়—সিগন্যাল চ্যাটে অংশগ্রহণ করেছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গাবার্ডও। আর সেই চ্যাটে ছিল হামলার সুনির্দিষ্ট সময়—“এটাই বোমা পড়ার নির্দিষ্ট মুহূর্ত”—যেমন বার্তা পড়ে কেঁপে উঠেছিল পুরো প্রশাসন। হামলায় অন্তত ৫৩ জন নিহত হয়, তাদের মধ্যে শিশুও ছিল।
ঘটনার সূত্রপাত: সাংবাদিক জেফরি গোল্ডবার্গ ভুলবশত সেই গ্রুপে ঢুকে পড়েন। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি প্রকাশ করেন পুরো ঘটনা—যা কংগ্রেসে ওঠে ঝড়ের মতো। সিনেট নেতা চাক শুমার একে বলেন সাম্প্রতিক সময়ে “সবচেয়ে বিস্ময়কর গোয়েন্দা বিপর্যয়”।
যেখানে হেগসেথ দাবি করছেন মুক্তির, সেখানে তদন্তের ফলাফল স্পষ্ট বলছে—তিনি রেকর্ড সংরক্ষণ করেননি, বিধি মানেননি, আর তা মার্কিন আইনের বিরোধী। নিজে সাক্ষাৎকার দিতেও অস্বীকার করেছেন; লিখিত জবাবেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন।
এ শুধু এক কেলেঙ্কারি নয়, আরও গভীর অন্ধকার লুকিয়ে আছে তার চারপাশে। ক্যারিবিয়ানে সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌকায় হামলার সময় তিনি নাকি মৌখিকভাবে বলেছিলেন—“সবাইকে শেষ করো”—দাবি উঠেছে এমনও। দ্বিতীয় হামলায় ডুবে থাকা দুই জীবিত মানুষও নিহত হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে বলছে বিচারবহির্ভূত হত্যা। জাতিসংঘও ক্ষোভ জানিয়েছে।
রাজনীতির ঝড় থামেনি। একদল রিপাবলিকান সমর্থন দিচ্ছে, আর অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা বলছে—এই অপরাধে যে কোনও কর্মকর্তা বরখাস্ত হতেন। সিনেটর মার্ক ওয়ার্নারের ভাষায়—“এটি স্রেফ ভুল নয়, এটি বিপজ্জনক উদাসীনতার নিদর্শন।”
ট্রাম্প সরকার তবে হেগসেথকে রক্ষার চেষ্টায় একধাপও পিছু হটেনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এটিকে বলেছেন “উইচ-হান্ট”—আর স্ক্যান্ডালের দায় চাপিয়েছেন অ্যাপের ওপর।
অতীতের ছায়াও ফিরে এসেছে নতুন করে—যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, মদ্যপানের বিতর্ক, আর অর্থ আত্মসাতের কথা। অভিযোগের জালে আটকে গেছেন বহুবার, কিন্তু তিনি অস্বীকার করে গেছেন সবই।
এখন অপেক্ষা সেই আংশিক প্রকাশ্য রিপোর্টের—যা হয়তো জানাবে, এই ঝড়ের কেন্দ্রে সত্যি কী ছিল: মুক্তি, নাকি আরও গভীর অন্ধকার।
একদিকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অন্যদিকে ক্ষমতার অলিন্দে বেপরোয়া আত্মবিশ্বাস—পিট হেগসেথ আজ যেন সেই দুই স্রোতের মাঝে দাঁড়ানো একজন বিতর্কিত সৈনিক, যার গল্প এখনও অসম্পূর্ণ।
















